কারাগার মানেই সাধারণত এক অন্ধকার, নিঃসঙ্গ ও গুমোট জীবন। কিন্তু মধ্য আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুনের দুয়ালা শহরের কুখ্যাত ‘নিউ বেল’ কারাগার যেন শহরের ভেতরেই অন্য এক আস্ত শহর! এখানে বন্দিরাই তাদের সহজ-শিথিল নিয়মে গড়ে তুলেছে এক ভিন্ন জগত।
বিশাল প্রাঙ্গণে চিঠিপত্র ও বার্তা পৌঁছে দিতে রয়েছে বন্দিদের নিজস্ব ‘ট্যাক্সি পরিষেবা’, কারারক্ষীদের সাথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে রয়েছে শক্তিশালী বন্দিদের ‘আইনশৃঙ্খল বাহিনী’, আর রয়েছে বাজার, যেখানে ভাজা কাসাভা ও বেগনি জাতীয় মিষ্টি বিক্রি হয়। তবে এই সব কিছুকে ছাপিয়ে এই কারাগারের সবচেয়ে বড় বিষ্ময় হলো- ‘জেল টাইম রেকর্ডস’। কারাগারের ভেতরে গড়ে ওঠা এই মিউজিক স্টুডিও ও রেকর্ড লেবেলটি অপরাধের গ্লানি মুছে কয়েদিদের বানিয়ে তুলছে আন্তর্জাতিক সংগীতারকা!

২০১৮ সালে ইতালীয় শিল্পী ডিওন রোচ যখন এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় কাজ করতে নিউ বেল কারাগারে যান, তখন একটি ড্যান্স ক্লাস চলাকালীন কয়েকজন বন্দি মাইক্রোফোন হাতে ফ্রি-স্টাইল র্যাপ গাইতে শুরু করে।
বন্দিদের এমন প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে রোচ কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জেল টাইম রেকর্ডস’। তিনি সঙ্গে নেন সাবেক বন্দি ও শব্দ প্রকৌশলী স্টিভ হ্যাপিকে। হ্যাপির গল্পটাও বেশ করুণ; বাবার মৃত্যুর পর পারিভাক বিরোধের জেরে বিচারক ফুফু তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়েছিলেন। দুই বছর পর অভিযোগ মুক্ত হলেও জেলের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন বদলে দেয়।
গরম, স্যাঁতসেঁতে আর ছোট্ট একটি ঘরের ভেতর একটি মাত্র কম্পিউটার নিয়ে পথচলা শুরু হয় এই মিউজিক স্টুডিওর। স্টিভ হ্যাপির মতে, সংগীত এখানে এক পরম মুক্তির হাতিয়ার। চার দেয়ালের বন্দিদশাকে ভুলে আমরা এখানে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা আর নিজেদের স্বর বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম খুঁজে পাই।

বর্তমানে এই জেলের বন্দিদের গাওয়া গান শুধু ক্যামেরুনেই সীমাবদ্ধ নেই; দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি আর্জেন্টিনার মতো সুদূর দেশের শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। জেলের ভেতরে ও বাইরে গ্যাং লিডার হিসেবে কুখ্যাত 'এম্পেরার'-এর একটি গানের ভিডিও যা পুরোপুরি জেলের ভেতরেই চিত্রায়িত, ইউটিউবে লাখো দর্শক দেখেছেন। সম্প্রতি কারা প্রাঙ্গণে কয়েদিদের জন্য এক বিশাল কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে কারাধ্যক্ষ নিজেও শিল্পীদের সঙ্গে নেচেছেন।
ডিওন রোচ ও স্টিভ হ্যাপির ছয় বছরের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় তৈরি ‘জেল টাইম রেকর্ডস’ নামক একটি তথ্যচিত্র সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের মর্যাদাপূর্ণ 'ট্রাইবেকা চলচ্চিত্র উৎসবে' সেরা ডকুমেন্টারি ফিচারসহ তিনটি বড় পুরস্কার জয় করে নিয়েছে। অস্কারজয়ী নিউজিল্যান্ডের পরিচালক তাইকা ওয়াইতিতি এবং তাঁর স্ত্রী গায়িকা রিতা ওরা এই তথ্যচিত্রের নির্বাহী প্রযোজক ছিলেন।
ওয়াইতিতি বলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জেলে থাকার সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের অপরাধবোধ থেকে মুক্তি ও পরিবর্তনের জন্য আর্ট বা সংগীত যে কতটা মানবিক ও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে, এটি তারই প্রমাণ।

তথ্যচিত্রে স্টোন' নামের এক বন্দির গল্প উঠে এসেছে, যিনি আগে প্রেসিডেন্টের গার্ড রেজিমেন্টের সৈনিক ছিলেন। ডাকাতির মিথ্যা অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া এই গায়ক স্টুডিওর মাইকে নিজের বুকভাঙা কষ্ট আর মেয়ের সান্নিধ্য পাওয়ার আকুলতা সুরের ভাষায় ফুটিয়ে তোলেন।
ধারণক্ষমতার চেয়ে চারগুণ বেশি (প্রায় ৪,৭০০ জন) বন্দি নিয়ে নিউ বেল কারাগারের পরিবেশ অত্যন্ত করুণ ও সহিংস। কয়েক বছর আগের কলেরা মহামারীতে সেখানে বেশ কজন বন্দি প্রাণ হারান। তবে এই কঠিন পরিস্থিতিতেও 'জেল টাইম রেকর্ডস' বন্দিদের ইতিবাচক জীবনের আলো দেখাচ্ছে। অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে- খুন বা অন্যান্য বড় অপরাধে যুক্ত বন্দিদের তারকা বানিয়ে কি অপরাধকে উসকে দেওয়া হচ্ছে না?
এই প্রশ্নের জবাবে সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডিওন রোচ স্পষ্ট করে জানান, আমরা কাউকে বিচার করতে আসিনি। এটি একটি মানসিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। সংগীতের মাধ্যমে বন্দিরা নিজেদের ভুল উপলব্ধি করতে পারে এবং নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পায়।

নারীদের উইংয়ে 'জেজে' নামের প্রথম নারী সংগীতশিল্পী ২০২২ সালে তাঁর আফ্রোবিটস গান ‘শো মি দ্য ওয়ে’ দিয়ে নজর কাড়েন। নিউ বেল কারাগারের এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পর, ২০২৩ সালে বুরকিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগুর কেন্দ্রীয় কারাগারেও একইভাবে একটি স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
কারাগারের নির্মম বাস্তবতায় যেখানে জীবনের আশা হারিয়ে যায়, সেখানে ‘জেল টাইম রেকর্ডস’ তৈরি করেছে এক টুকরো স্বর্গ। সামাজিক অবহেলা ও অপরাধের অন্ধকার পেছনে ফেলে এই বন্দিরা আজ অনুভব করছেন, সমাজ ও সংস্কৃতির মূলধারায় তাঁদেরও একটি সম্মানজনক অবস্থান তৈরি হয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
