জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে পেন্টাগনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ট্রান্স-আটলান্টিক মিত্রদের মধ্যে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার ঘোষিত এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস শনিবার জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতি ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে উৎসাহিত করবে। তবে, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ নিয়ে স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা এবং ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন, সংখ্যা শুধু পাঁচ হাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভবিষ্যতে আরও অনেক সেনা সরিয়ে নেয়া হবে। মূলত ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপের সাথে মতভেদ এবং গাড়ি আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি, এই দ্বিমুখী চাপে জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন তলানিতে। পেন্টাগন জানিয়েছে, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শেষ হবে। তবে এই সেনারা ইউরোপের অন্য কোথাও মোতায়েন হবে নাকি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
জার্মানির জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে দূরপাল্লার টমাহক মিসাইলসহ একটি মার্কিন ব্যাটালিয়ন মোতায়েনের পরিকল্পনা বাতিল হওয়া। বাইডেন প্রশাসনের নেয়া এই উদ্যোগটি রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটোর ভেতরে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। ফলে এই ব্যাটালিয়ন মোতায়েন না হওয়া সেনা সংখ্যা কমানোর চেয়েও কৌশলগতভাবে অনেক বেশি গুরুতর ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিস্টোরিয়াস বিষয়টিকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ইউরোপীয় হিসেবে আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। জার্মানি ইতিমধ্যে তাদের সক্রিয় সেনাসংখ্যা ১ লক্ষ ৮৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ লক্ষ ৬০ হাজারে উন্নীত করার কাজ শুরু করেছে।
অন্যদিকে, পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একে জোটের ভাঙন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, আটলান্টিক ওপারের এই মিত্রতা ভেঙে যাওয়া বাইরের শত্রুর চেয়েও বড় হুমকি। মার্কিন সেনেটর রজার উইকার এবং প্রতিনিধি মাইক রজার্সও এই সিদ্ধান্তকে ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে ভুল বার্তা পাঠানোর ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, সেনা প্রত্যাহার না করে বরং ইউরোপের পূর্ব প্রান্তে সরিয়ে নেওয়া উচিত ছিল।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জের দলের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কর্মকর্তা পিটার বেয়ার মনে করেন, এই সিদ্ধান্তগুলো কোনো সুসংগত কৌশলের অংশ নয়, বরং ট্রাম্পের হতাশা এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ। জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকা এবং ইউক্রেন ও ইরানের মতো অমীমাংসিত সংকটের চাপে থাকা ট্রাম্প প্রশাসন এখন ইউরোপের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সামরিক ও বাণিজ্যিক, উভয় অস্ত্রই ব্যবহার করছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জার্মানিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি বড় ঢাল হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে রামস্টেইন এয়ারবেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যত এবং ইউরোপের নিজস্ব নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি হয়েছে। মিত্রদের মধ্যে দূরত্ব শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে রুশ প্রভাব বাড়াতে সহায়ক হবে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
