ইউরোপের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৮ জন যাত্রী নিহত এবং বহু মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পর গভীর শোকে নিমজ্জিত পুরো স্পেন। মর্মান্তিক এই ট্র্যাজেডিতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে, দুর্ঘটনাস্থলে শক্তিশালী ফ্লাডলাইটের আলোয় সারা রাত ধরে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া মেটাল বগিগুলো কেটে উদ্ধারকাজ চালিয়েছেন জরুরি সেবার কর্মীরা। নিহতদের অনেকের পরিচয় এখনো মেলেনি, তাদের শনাক্তে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে স্প্যানিশ সিভিল গার্ড।

রেল দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে। জানা গেছে, যান্ত্রিক ও কম্পিউটার বিভ্রাটের কারণে বেসরকারি সংস্থা 'আইরিও'র ১৪৭ জন যাত্রী বহনকারী ট্রেনটি লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল।
নিয়ম অনুযায়ী, সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দিলে মাদ্রিদের ২৪ ঘণ্টার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ট্রেন পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ‘অ্যাখ্যাত ও অবিশ্বাস্য’ এক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কোনো ধরনের গতিসীমা নির্ধারণ ছাড়াই পেছনের রেনফে ট্রেনটিকে সামনে এগোনোর সংকেত দেওয়া হয়।

মাদ্রিদের ট্রেন কন্ট্রোলার ও চালকদের অডিও রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সামনের ট্রেনটি লাইনে বিকল হয়ে থাকা সত্ত্বেও পেছনের ট্রেনকে এগোতে ক্লিয়ারেন্স দেয়া হয়েছিল। ৩৯৭ জন যাত্রী নিয়ে রেনফে কোম্পানির উচ্চগতির ট্রেনটি দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটির পেছনে সজোরে ধাক্কা দিলে তীব্রতায় বেশ কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে নিচের খাদে গড়িয়ে পড়ে। এক বগিতে আগুন ধরে যায়, ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের কান্নাকাটি ও রক্তাক্ত চেহারার দৃশ্য এক বীভৎস অবস্থার সৃষ্টি করে।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, আজ পুরো স্পেন শোকাচ্ছন্ন। অজস্র জীবন এক মুহূর্তে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে, পরিবারগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এই বেদনার কোনো পরিমাপ নেই। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, একই বছরের মধ্যে একই রেললাইনে দুটি বড় ধরনের রেল বিপর্যয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ঘটনার পর দেশটির বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল নির্বাচনী প্রচারণা স্থগিত করলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার রাতে রাজধানী মাদ্রিদে পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সামনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ জমায়েত হয়ে প্রধানমন্ত্রী ও পরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ার গ্যাসে মেরে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে।
অন্যদিকে, ‘রেল নিরাপত্তার স্বার্থে’ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে স্প্যানিশ ইউনিয়ন অব রেলওয়ে ড্রাইভার্স । প্রধান বিরোধী দল পিপি’র নেতা আলবার্তো নুনেজ ফেজি বলেছেন, আমাদের রেল অবকাঠামোর নিরাপত্তার আসল সত্যটা জানার অধিকার দেশের মানুষের আছে।

দুর্ঘটনার স্মরণে টলেডোতে স্থানীয় বাসিন্দারা এক মিনিটের নীরবতা পালন করেছেন। এছাড়া স্পেনের এই কঠিন সময়ে সমবেদনা ও সংহতি জানিয়ে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল কার্যালয়ে ইইউ পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে সান্তিয়াগো দে কম্পোস্টেলায় ৮০ জনের প্রাণহানির পর এটিই স্পেনের মাটিতে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনা।
