আমেরিকা ও ইসরাইলি বাহিনী ইরানজুড়ে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার এক নতুন ঢেউ শুরু করেছে। এই হামলায় মূলত আবাসিক এলাকা এবং বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যার ফলে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু ও অসংখ্য আহতের খবর পাওয়া গেছে। খবর প্রেস টিভি।
ইরানি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, বুধবার ভোরে পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তাবরিজের বেশ কয়েকটি আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে রেলওয়ে শ্রমিকদের বসবাসের এলাকাগুলোতে এই হামলা চালানো হয়, যার ফলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয়েছে এবং অনেক বাসিন্দা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন।

তাবরিজ সংকট মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের একটি বিবৃতি অনুযায়ী, এর আগের দিনও শহীদ মোফাত্তেহ আবাসিক এলাকায় ছয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং নয়জন আহত হয়েছিলেন।
ধ্বংসস্তূপ থেকে হেলমা নামের এক ছোট্ট শিশুকে উদ্ধারের ভিডিও রেড ক্রিসেন্টের ইনস্টাগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত হওয়ার পর তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের 'অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪'-এর ৭৯তম ধাপটি এই ১৮ মাস বয়সী শিশু এবং তার শহীদ পরিবারের নামে উৎসর্গ করেছে। এই অভিযানে ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে পরিষেবা প্রদানকারী স্যাটেলাইট স্টেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন বিমানঘাঁটিসহ বেশ কিছু সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
হামলা শুধু তাবরিজেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তেহরান এবং ইয়াজদ থেকেও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। তেহরানের পূর্বাঞ্চলে বোমা হামলায় ঘরবাড়ির জানালার কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইয়াজদ শহরে ডিনা সাদেঘি নামের ১০ বছর বয়সী এক শিশু তার বাড়ির কাছে হওয়া বিস্ফোরণের শব্দে প্রচণ্ড আতঙ্ক ও মানসিক আঘাতে (শক) মারা গেছে।

অস্ট্রিয়ায় অবস্থিত ইরান দূতাবাস এই বিমান হামলাকে ইরানবিরোধী দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দূতাবাস জোর দিয়ে বলেছে, এই হামলায় স্কুল, হাসপাতাল এবং আবাসিক এলাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক নৌ-চলাচলের পথ ধ্বংস করার ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক শিপিং লেনটি এখন চলাচলের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে।
ইরানের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত অবকাঠামোও এই হামলার হাত থেকে রেহাই পায়নি। তেহরানের নিকটবর্তী শহর রেই-এর 'ভেলা কালচারাল সেন্টার' মঙ্গলবার রাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এতে পার্শ্ববর্তী আবাসিক এলাকারও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং ৪ জন নিহত ও ৬ জন আহত হয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, এমনকি ক্যন চলচ্চিত্র উৎসবে 'পাম দ’র' জয়ী বিশ্ববিখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামির বাড়িটিও এই সন্ত্রাসী হামলা থেকে রক্ষা পায়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ১৯৯৭ সালে ‘টেস্ট অফ চেরি’ সিনেমার জন্য গোল্ডেন পাম জয়ী এই পরিচালকের বাড়িটিও কি আমেরিকার জন্য হুমকি ছিল?

শিক্ষা খাতের ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব আরও ভয়াবহ। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, এখন পর্যন্ত ৬৪০টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫৭টি স্কুল, ৪২টি প্রশাসনিক কার্যালয় এবং ৪৫টি সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া স্থাপনা রয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯২ জন শিক্ষার্থী এবং ৫১ জন শিক্ষকসহ মোট ২৪৩ জন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন এবং ১৮৪ জন আহত হয়েছেন।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে, যেখানে আগ্রাসনের প্রথম দিনেই একটি প্রাথমিক স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে ১৭০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিহত হন। একটি বেসামরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের হামলা মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর নির্বিচার ও নিষ্ঠুর অমানবিকতার চিত্রই ফুটিয়ে তুলছে।
