দীর্ঘ এক মাস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর অবশেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের এক সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ইরানকে ‘ধূলিসাৎ’ করে দেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা পার হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই সিদ্ধান্ত আসে।
এই যুদ্ধবিরতির ফলে ইরান সাময়িকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ উন্মুক্ত করে দিতে রাজি হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে উভয় পক্ষই নিজেদের জয় দাবি করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল বলেছে, তাদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের মুখে আমেরিকা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে এবং এটি ইরানি জাতির এক ঐতিহাসিক বিজয়। আগামী শুক্রবার থেকে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে এই সংকট নিরসনে উভয় দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা পরিকল্পনা: ইরান এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি ১০-দফা খসড়া পরিকল্পনা পেশ করেছে, যাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনার জন্য ‘কার্যকর ভিত্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যদিও এর অনেকগুলো শর্ত ওয়াশিংটনের কাছে আগে অগ্রহণযোগ্য ছিল, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সুর কিছুটা নরম দেখা যাচ্ছে। ইরানের এই পরিকল্পনার প্রধান শর্তগুলো হলো:
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ: ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর তাদের সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়।
পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ: এই পরিকল্পনার ফারসি সংস্করণে ইরান পরিষ্কার জানিয়েছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়াকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর আরোপিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সকল প্রকার মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে।
আঞ্চলিক সেনা প্রত্যাহার: মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে সকল ঘাঁটির পাশাপাশি মার্কিন যুদ্ধবিমান ও সেনাদল সরিয়ে নিতে হবে।
সম্পদ মুক্তি ও ক্ষতিপূরণ: যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ করা ইরানের সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্পদ ছেড়ে দিতে হবে এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ইরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
আগ্রাসন বন্ধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: ইরান এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের (যেমন লেবাননের ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধা) ওপর সব হামলা বন্ধ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা: এই চুক্তিকে একটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষ এটি লঙ্ঘন করতে না পারে।
যদিও ট্রাম্প এই প্রস্তাবগুলোকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন, তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, আলোচনার চূড়ান্ত রূপরেখা এখনো প্রক্রিয়াধীন। ইরানের পক্ষ থেকে ফরাসি এবং ইংরেজি সংস্করণে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের শর্তটি নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা থাকলেও তেহরান এটি তাদের প্রধান দাবি হিসেবেই বিবেচনা করছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের মধ্যস্থতায় হওয়া এই যুদ্ধবিরতি আপাতত বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ থামিয়ে দিলেও, স্থায়ী শান্তি নির্ভর করছে আগামী দুই সপ্তাহের কূটনীতির ওপর। দুই দেশ কি একটি ‘নিশ্চিত চুক্তিতে’ পৌঁছাতে পারবে, নাকি এটি কেবল সাময়িক বিরতি, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো বিশ্ব।
তথ্যসূত্র: ফ্রেঞ্চ টোয়েন্টিফোর-এনডিটিভি
আমেরিকা-ইরানের মন গলালো পাকিস্তান ও চীন
পর্দার আড়ালে যেভাবে কাটলো ‘স্নায়ুক্ষয়ী’ যুদ্ধের মেঘ