ইসলামাবাদে রবিবারে শেষ হওয়া ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে, যা বর্তমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার পর এই আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে।
দীর্ঘ সময় চলা স্নায়ুক্ষয়ী আলোচনার পর কোনো সমঝোতা ছাড়াই অবশেষে পাকিস্তান ছাড়লেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা। মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রধান ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স ইসলামাবাদ ত্যাগ করার আগে সাংবাদিকদের বলেন, খারাপ খবর হলো আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি। তবে আমার মনে হয় এটি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য অনেক বেশি খারাপ খবর। তিনি স্পষ্ট করে দেন, ওয়াশিংটন তার ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমার বিষয়ে কোনো আপস করবে না।
পারমাণবিক কর্মসূচি ও ‘রেড লাইন’ নিয়ে বিরোধ: ভ্যান্স জানান, ইরান মার্কিন শর্তগুলো মেনে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ছিল ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করে এবং এমন কোনো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন না করে, যা তাদের দ্রুত পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত করতে পারে।
তিনি আরও জানান, আলোচনার সময় তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে অন্তত এক ডজন বার কথা বলেছেন। তবে, ট্রাম্প শনিবারই মন্তব্য করেছিলেন, চুক্তি হওয়া বা না হওয়া তাঁর কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ তাঁর মতে ‘আমেরিকা ইতিমধ্যেই যুদ্ধে জিতে গেছে’।

ইরানের পাল্টা অভিযোগ- অতিরিক্ত দাবি: ইরানি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত’ ও অযৌক্তিক দাবির কারণেই চুক্তি সম্ভব হয়নি। ইরানি গণমাধ্যমগুলোর মতে, অনেক বিষয়ে ঐকমত্য হলেও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, অবিশ্বাসের পরিবেশে এই আলোচনা হয়েছে এবং মাত্র একটি অধিবেশনে সব সমস্যার সমাধান আশা করা স্বাভাবিক নয়।
হরমুজ প্রণালী ও লেবানন ইস্যু: তেহরান শুধু বিদেশের ব্যাংকে জব্দকৃত অর্থ ফেরত পাওয়াই নয়, বরং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে ইসরাইল কর্তৃক লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বন্ধ করার বিষয়ে ইরান অনড় ছিল। তবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল স্পষ্ট করে দিয়েছে, লেবাননের সংঘাত এই আলোচনার অংশ নয়।

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও ভবিষ্যৎ: পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার উভয়পক্ষকে গত মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে ইসরাইলের নিরাপত্তা ক্যাবিনেট মন্ত্রী জিভ এলকিন সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনার পথ খোলা থাকলেও ইরানিরা আগুন নিয়ে খেলছে।
ইসলামাবাদে এই ব্যর্থতা সত্ত্বেও শনিবার তিনটি বড় তেলের ট্যাঙ্কারকে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে দেখা গেছে, যা যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রথম কোনো জাহাজের বহির্গমন। তবে এখনো শত শত ট্যাঙ্কার সেখানে আটকা পড়ে আছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই ছিল দু’দেশের মধ্যে সবচাইতে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি বৈঠক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারায় মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। এখন সবার নজর পরবর্তী দুই সপ্তাহের দিকে, উভয় পক্ষ কি পুনরায় আলোচনায় বসবে, নাকি আবারও রণক্ষেত্রে ফিরে যাবে?
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
