যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বাহিনীর সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বিরুদ্ধে চলমান ৪০ দিনের যুদ্ধে ব্যবহৃত ইরানি সামরিক সামগ্রীর মধ্যে একটি বিশেষ ড্রোন পশ্চিমা আকাশ প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছে। সেটি হলো ঐতিহ্যবাহী শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের জেট-চালিত আধুনিক সংস্করণ 'শাহেদ-২৩৮'।
কিছু পরিমাণ পাল্লা বিসর্জন দিয়েও এর গতি বহুগুণ বৃদ্ধি করায় ড্রোনটি বহুস্তর বিশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক অত্যন্ত জটিল ও কম খরচের মারণাস্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে আইআরজিসি এরোস্পেস ফোর্সের এক প্রদর্শনীতে ইসলামী বিপ্লবের তৎকালীন নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনির উপস্থিতিতে শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ প্রথম এই ড্রোনটি সামনে আনে।
অন্যান্য প্রদর্শনীর পণ্যের মতো এটি শুধু সাজিয়ে রাখার মতো বস্তু ছিল না; বরং ২০২৫ সালের শেষের দিকেই এর ছোট আকারের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় এবং ১২ দিনের যুদ্ধ ও পরবর্তী ৪০ দিনের যুদ্ধে এটি পূর্ণাঙ্গ ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

শাহেদ-২৩৮ এবং এর পূর্বসূরী শাহেদ-১৩৬-এর মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো এর চালিকাশক্তি। যেখানে শাহেদ-১৩৬ ড্রোনে ইরানে তৈরি পিস্টন ইঞ্জিনের সাহায্যে পেছনের প্রোপেলার চালানো হতো, সেখানে শাহেদ-২৩৮-এ সেই পুরনো ব্যবস্থা পুরোপুরি বদলে বসানো হয়েছে একটি সংকুচিত টার্বোজেট ইঞ্জিন।
উদ্ধার করা ড্রোনের কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এতে ইরানের নিজস্ব তৈরি 'তুলু-১০' সিরিজের টার্বোজেট এবং ক্ষেত্রবিশেষে চেক প্রজাতন্ত্রের তৈরি 'পিবিএস টিজে১৫০' মডেলের বাণিজ্যিক হালকা টার্বোজেট ব্যবহার করা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে ড্রোনের কার্যক্ষমতায় আমূল পরিবর্তন এসেছে; পূর্বে শাহেদ-১৩৬ যেখানে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ১৮৫ কিলোমিটার গতিতে উড়ত, সেখানে শাহেদ-২৩৮ মাঝপথে ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার গতি অর্জন করে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের ঠিক আগমুহূর্তে বা টার্মিনাল ফেজে এর গতি ঘণ্টায় ৭০০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়।
সাড়ে তিন মিটার দৈর্ঘ্য এবং তিন মিটার ডানার বিস্তারের এই ড্রোনটি প্রায় ৯,০০০ মিটার উঁচুতে উড়তে পারে এবং এতে ৫০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক ওয়ারহেড বহন করা সম্ভব। তবে একটি পিস্টন ইঞ্জিনের এয়ারফ্রেমে টার্বোজেট ইঞ্জিন ফিট করার কারণে কিছু খেসারত দিতে হয়েছে।

ড্রোনে বাতাস প্রবেশের জন্য ওপরের অংশে পরিবর্তন আনা, অতিরিক্ত ওজন যুক্ত হওয়া এবং পেট্রোলের বদলে জেট-এ জ্বালানি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতার কারণে এর সর্বোচ্চ টেক-অফ ওজন ২৫০ কেজি থেকে বেড়ে ৩৮০ কেজিতে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে জ্বালানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে এবং শাহেদ-১৩৬-এর মতো দূরপাল্লার সক্ষমতা এটি হারিয়েছে। তবে ইরান কৌশলগতভাবেই সর্বোচ্চ পাল্লার চেয়ে দ্রুত গতি ও কম প্রতিক্রিয়া সময় পাওয়ার সুবিধাকেই প্রাধান্য দিয়ে ড্রোনটির নকশা তৈরি করেছে।
৪০ দিনের যুদ্ধে কৌশলগত ব্যবহার ও প্রভাব: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি জোটের বিরুদ্ধে চালানো প্রতিরোধ অভিযানে হাজার হাজার ড্রোন ব্যবহার করে ইরানি বাহিনী। এই অভিযানে ধীরগতির ড্রোনগুলোর সাথে শাহেদ-২৩৮ ড্রোনকে এক বিশেষ উচ্চগতির ইউনিট হিসেবে যুক্ত করা হয়, যেন শত্রুপক্ষের সতর্ক হওয়ার সময় কমিয়ে দেয়া যায় এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা অপারেটরদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়কে সংকুচিত করা যায়।
অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরাইলি সামরিক সম্পদের ওপর আঘাত হানার পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলেও সফল হামলা চালিয়েছে এই ড্রোনটি। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ের একটি হোটেলের সম্মুখভাগে শাহেদ-২৩৮ সরাসরি আঘাত হানে, যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই হাই-স্পিড ড্রোনের নিখুঁত আঘাতের অন্যতম বড় প্রমাণ।

গতির সমীকরণ ও প্রতিপক্ষের দ্বিধা: শাহেদ-২৩৮-এর মূল সামরিক সাফল্য লুকিয়ে আছে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমীকরণ বদলে দেওয়ার মধ্যে। আধুনিক ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলো মূলত শাহেদ-১৩৬-এর মতো ধীরগতির উড়ন্ত বস্তুর ওপর ভিত্তি করে সময় হিসাব করে তৈরি, যা চিহ্নিত ও ভূপাতিত করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়।
কিন্তু প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ থেকে ৭০০ কিলোমিটার গতিতে ধেয়ে আসা কোনো ড্রোন সেই সময়কে অনেকাংশে কমিয়ে দেয়, ফলে শত্রুপক্ষের রাডারে তা শনাক্তকরণ, ট্র্যাকিং এবং ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সময়সীমা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে। তা ছাড়া, শাহেদ-২৩৮-এর বিশেষ সংস্করণে রাডার ধ্বংস করার জন্য অ্যান্টি-রেডিয়েশন গাইডেন্স এবং ইনফ্রারেড সিকার যুক্ত করা হয়েছে, যা শত্রুপক্ষের রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করার মতো বিপজ্জনক মিশন অনায়াসে সম্পন্ন করতে পারে।
ইরানের মূল কৌশল হলো প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষামূলক ক্ষয়ের মুখে ফেলা। একটি শাহেদ-২৩৮ ড্রোনের উৎপাদন খরচ ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে শত্রুপক্ষ একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে গিয়ে কোটি ডলারের মূল্যবান অ্যান্টি-মিসাইল খরচ করতে বাধ্য হয়, যা তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুদ দ্রুত নিঃশেষ করে দেয়।
একই সাথে শাহেদ-১৩১, শাহেদ-১৩৬ এবং দ্রুতগতির শাহেদ-২৩৮ ড্রোনের সমন্বিত বা ঝাঁকবদ্ধ বা 'মিক্সড সালভো' আক্রমণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কম্পিউটারকে বিভ্রান্ত করে ফেলে, অপারেটররা দ্বিধায় পড়ে যান যে তারা কি ধীরগতির বিশাল ঝাঁককে থামাবেন নাকি দ্রুতগতির শাহেদ-২৩৮ কে ধ্বংস করবেন।

উৎপাদন সক্ষমতা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা: বিভিন্ন ওপেন সোর্স ও সামরিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ইরান প্রতি মাসে প্রায় ২০০টিরও বেশি শাহেদ-১৩৬ ও শাহেদ-২৩৮ ড্রোন তৈরি করছে। অন্য দেশে সমান্তরাল উৎপাদন যুক্ত করলে তাদের যৌথ উৎপাদন ক্ষমতা মাসে ৪০০ থেকে ৫০০ ইউনিটে দাঁড়ায়।
পরবর্তী সময়ে ড্রোনগুলোতে আরও বড় ওয়ারহেড, বিমান থেকে নিক্ষেপ করার সুবিধা এবং শক্তিশালী জ্যামিং-বিরোধী গাইডেন্স প্রযুক্তি যুক্ত করার তথ্য জানা গেছে।
শাহেদ-২৩৮ ড্রোন যুদ্ধের মোড় শতভাগ ঘুরিয়ে দেবে কি না তা নিশ্চিত না হলেও, এটি যে বিশ্বজুড়ে সস্তা ড্রোনের হুমকি এবং আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পুরো ধারণাকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে, সে বিষয়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।
তথ্যসূত্র: প্রেস টিভি
