ইসরাইলের ২৭ অক্টোবরের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও নতুন সরকার গঠনের প্রাথমিক দায়িত্ব পেয়েছেন ইয়াশার (স্ট্রেইট) পার্টির নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে ২৮ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন, যা প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে।
নির্ধারিত সময়ে আইজেনকোট ব্যর্থ হলে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আবার সুযোগ দেয়া হবে, আর সেটাও ব্যর্থ হলে দেশকে শেষ পর্যন্ত আবারও নতুন নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে।
নেতানিয়াহু এতদিন যে ধরনের অনুগত কট্টরপন্থী ও ডানপন্থী সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন, আইজেনকোটের জন্য সে রকম সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়ে তোলা মোটেও সহজ হবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চতুর রাজনৈতিক কৌশল ও কূটচালে অভ্যস্ত নেতানিয়াহুর তুলনায় আইজেনকোট রাজনীতিতে অনেকটাই নতুন ও নবাগত।

আইজেনকোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মূল চাবিকাঠি ঝুলছে দুই গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীর ওপর:
১. আল্ট্রা-অর্থোডক্স ধর্মীয় গোষ্ঠী: ঐতিহ্যবাহী মিত্র শাস পার্টিকে ছেড়ে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম পার্টি নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আইজেনকোট যদি তাদের সমর্থন পেতে চান, তবে আল্ট্রা-অর্থোডক্স তরুণেরা যাতে সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান থেকে অব্যাহতি পায়, সেই বিতর্কিত ‘সামরিক ছাড়’ সুবিধা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
২. ইসরাইলি আরব ও ফিলিস্তিনি দলসমূহ: যৌথ তালিকার বামপন্থী হাডাশ পার্টির নেত্রী আয়দা তুমা-স্লিমান স্পষ্ট জানিয়েছেন, আইজেনকোট ফিলিস্তিনি বা আরব ভোটার ও দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে রাজি নন। তিনি আরবদের সমর্থনের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে ধর্মীয় আল্ট্রা-অর্থোডক্সদের সঙ্গে সেনাসেবা ছাড় আইনের বিষয়ে আপস করতেই বেশি ইচ্ছুক।

তবে বাইরে থেকে আরব দলগুলো সমর্থন দিলে তারা অবশ্যই ইসরাইলের দখলকৃত আরব এলাকায় অপরাধের ভয়াবহ ঢেউ থামানো এবং পশ্চিম তীরে কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোটরিচদের উসকানিতে চলা ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংস হামলা বন্ধের দাবি তুলবে।
গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং ইরানে হামলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির ভাবমূর্তি এখন সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। গাজা সংঘাতের জেরে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি ইসরাইলে বার্ষিক ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা প্যাকেজ বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। তার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দল ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়, যেখানে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা এই হারের দায় চাপান ইরান-সংক্রান্ত যুদ্ধ নীতির ওপর।
কার্নেগি অ্যান্ডোমেন্টের সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, আইজেনকোটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত বৈরী এক মার্কিন রাজনৈতিক পরিবেশের মুখোমুখি হতে হবে, কারণ বিশ্ববাসীর চোখে ইসরাইল এখন আর ‘ডেভিড’ নয়, বরং এক ‘গোলিয়াথ’ বা আক্রমণকারী হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে।

‘অ্যান্টি-বিবি’ পরিচিতি ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি: নেতানিয়াহুর মতো বিলাসী বা অভিজাত ঘরানার রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড আইজেনকোটের নেই। তিবেরিয়াসে জন্ম নেওয়া মরক্কো থেকে আগত এক অভিবাসী পরিবারের সন্তান আইজেনকোট ১৮ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ধাপ অতিক্রম করে সেনাপ্রধান হন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর তৈরি হওয়া যৌথ সরকারে যোগ দেওয়া আইজেনকোট ব্যক্তিগত জীবনে এক গভীর ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে গেছেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে উত্তর গাজার জাবালিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে তার ছেলে গাল মেইর নিহত হন। তার পরদিনই ভাইপো মাওর এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে আরেক ভাইপো যোগেভ পাজি গাজায় নিহত হন।
এই পারিবারিক আত্মত্যাগ ইসরাইলি সাধারণ জনগণের চোখে তাকে নেতানিয়াহু পরিবারের বিলাসিতা ও রাজনীতির বাইরে এনে এক সাধারণ ও নীতিবান সাধারণ মানুষের (‘অ্যান্টি-বিবি’) মর্যাদা দিয়েছে। চ্যাথাম হাউসের সিনিয়র ফেলো ইউসি মেকেলবার্গ মন্তব্য করেছেন, আইজেনকোট এই মুহূর্তে ইসরাইলে একটি স্থিতিশীলতা ও নিয়মানুবর্তিতার বার্তা দিচ্ছেন, যা দেশটির খুব বেশি প্রয়োজন।

ফিলিস্তিন নীতি ও কট্টর সামরিক ইতিহাস: ব্যক্তিগতভাবে সাধারণ ও সোজাসাপ্টা ভাবমূর্তি থাকলেও ফিলিস্তিনিদের জন্য গাদি আইজেনকোটের আগমন কোনো স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসছে না। ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের সময় বেসামরিক অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের ওপর আনুপাতিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি সামরিক শক্তি প্রয়োগের নীতি যা ‘দাহিয়াহ ডকট্রিন’ নামে পরিচিত, তারই তৈরি।
২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সেনাপ্রধান হিসেবে তার মেয়াদে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী অন্তত ৬৫০ জন ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত হন। বিশেষ করে ২০১৮ সালের গাজার ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’ চলাকালে তার নির্দেশে পরিচালিত অভিযানে ৩৫টি শিশুসহ ১৮৯ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। পরবর্তীতে জাতিসংঘের এক কমিশন তার কমান্ডে থাকা ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ নিশ্চিত করে।
অতএব, বেন-গভিরদের মতো উগ্র ডানপন্থীদের সাথে তিনি সরকারে বসতে অস্বস্তি প্রকাশ করলেও, সাবেক সেনাপ্রধান হিসেবে গাদি আইজেনকোটের শক্ত ও নির্মম সামরিক ইতিহাস নিশ্চিত করে যে প্রধানমন্ত্রী হলেও ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের কঠোর নীতিতে বড় কোনো মানবিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা-রয়টার্স
