বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হবার পর ক্রমেই উপকূলের দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করেছে ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’। বর্তমানে এটি পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে সাড়ে ৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর প্রভাবে এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে এবং কোথাও কোথাও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিও দেখা দিয়েছে। রাতে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে।
সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’ মোকাবিলায় স্ট্যান্ডিং অর্ডারস অন ডিজাস্টার (এসওডি) অনুযায়ী ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন উপকূলীয় জেলার জেলা প্রশাসকরা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে এবং প্রস্তুত রাখা হয়েছে সিপিপি ও রেডক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবকদের। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আগাম যেসব কার্যক্রম দরকার সেগুলো নেওয়া হয়েছে।
বুধবার রাতে, পূর্বমধ্য বঙ্গোপসাগর ও আশপাশের এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’ নিয়ে ছয় নম্বর বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে পূর্বমধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থান করছে।

এটি বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ৫৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থান করছিলো।
ঘূর্ণিঝড়টি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে এগিয়ে ঘনীভূত হতে পারে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ঘণ্টায় ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর খুবই উত্তাল রয়েছে।
এ অবস্থায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
ঝড়ের প্রভাবে সাতক্ষীরা, সুন্দরবন, লক্ষ্মীপুর, পটুয়াখালী, কক্সবাজারের টেকনাফ-সেন্টমার্টিনসহ উপকূলীয় এলাকায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। লক্ষ্মীপুর-ভোলা-বরিশাল এবং টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক জায়গায় সকাল থেকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিলো।

বিকেল থেকে ঝড়ো হওয়া শুরু হয়। আবহাওয়া দপ্তর বলছে, বৃহস্পতিবার রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সে সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’র বর্তমান গতিপ্রকৃতি অনুসারে আবহাওয়াবিদদের মতে, এটি আছড়ে পড়তে পারে ভারতের ওড়িশা উপকূলে। এর প্রভাব পড়তে পারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উপকূলীয় খুলনা-বরিশালের বিভিন্ন এলাকায়। তবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এখন পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় দানার যে গতিবিধি, তাতে এটি ভারতের ওড়িশা উপকূলমুখী। ধামারা বন্দরের দিকেই এটি উপকূল অতিক্রম করতে পারে। ঘূর্ণিঝড়টির অতিক্রম করার যে এলাকা, সেখান থেকে বাংলাদেশের উপকূল ডান দিকে।
ডান দিকে থাকার কারণে, বাংলাদেশের উপকূলে এটির প্রভাব থাকবে অপেক্ষাকৃত বেশি। বাঁ দিকে থাকলে, সাধারণত কম থাকে। বুধবার রাতেই শক্তি বাড়বে ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’র। রাত সাড়ে ১১টার পর তা প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে, জানিয়েছে হাওয়া অফিস। বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে শক্তি আরও বাড়বে।

ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, নিম্নচাপের কারণে বুধবার আন্দামানের উপকূলীয় এলাকায় ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ওড়িশার উপকূলে আঘাত হানতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা, কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম এবং বাঁকুড়ায় বিক্ষিপ্ত ভাবে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাত বা পরদিন শুক্রবার ভোরের কোন এক সময়ে ‘দানা’ ওড়িশার ভিতরকনিকা থেকে ধামারা বন্দর এলাকা অতিক্রম করতে পারে৷ অতিক্রম করার সময় এর বাতাসের গতিবেগ থাকতে পারে ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার৷ এটি সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
ক্রান্তীয় সাইক্লোন নামকরণ পদ্ধতি অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’-এর নামকরণ করেছে কাতার। আরবিতে ‘দানা’ শব্দের অর্থ উদারতা। অঞ্চলের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ক্রান্তীয় সাইক্লোনের নামকরণের প্রস্তাব দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগরে প্রাক বর্ষা মৌসুম (এপ্রিল-মে) ও প্রি বর্ষা মৌসুমে (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। ১৮৯১ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত অক্টোবর মাসে বঙ্গোপসাগরে ৯৪টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে। এসবের মধ্যে ১৯টি ঝড় বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে।

বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত করা ঝড়গুলোর মধ্যে বেশিরভাগ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের ওপর দিয়ে গেছে। গত বছরই বছরের এ সময়ে তিনটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছিল বঙ্গোপসাগরে। গত বছরের অক্টোবরে ‘হামুন’, নভেম্বরে ‘মিধিলি’র পর ডিসেম্বরে ‘মিগজাউম’ নামের তিনটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছিলো।
চলতি মাসের আবহাওয়া দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসেও এক থেকে তিনটি লঘুচাপ বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এদের মধ্যে একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে বলা হয়েছিলো। ইতোমধ্যে একটি নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’য় পরিণত হয়ে উপকূলের পথে রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’র প্রভাবে হাতিয়ার সঙ্গে সারাদেশের নৌ যোগাযোগ বন্ধ
ঘূর্ণিঝড় দানা: চার বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত