কানসাস সিটির ভ্যাপসা গরম আর ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুক্রবার ঘানাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ১৬ বা কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ে পৌঁছে গেছে কলম্বিয়া। আসরের শুরু থেকেই খুব বেশি হইচই না করে লাইমলাইটের আড়ালে থাকা এই ‘লস ক্যাফেতেরোস’রা যে যেকোনো বড় দলের জন্য কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তা তারা আরও একবার প্রমাণ করল।
ম্যাচের ১৪ মিনিটে জন আরিয়াসের করা একমাত্র গোল এবং নেস্টর লরেঞ্জোর শিষ্যদের জমাট রক্ষণভাগের ওপর ভর করে কলম্বিয়া তাদের অপরাজেয় যাত্রার রেকর্ড ধরে রেখে শেষ ষোলোর মঞ্চে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার টিকিট কেটে ফেলেছে।

গ্রুপ পর্বে পর্তুগাল, উজবেকিস্তান ও ডিআর কঙ্গোর মতো দল নিয়ে কে-গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে এলেও কলম্বিয়াকে নিয়ে মাতামাতি কিছুটা কমই ছিল। তবে শুক্রবারের ম্যাচে তারা যে ফুটবল উপহার দিল, তা কানসাস সিটিকে মুহূর্তের মধ্যেই কলম্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী শহর ‘বারানকিল্লা’য় রূপান্তর করেছিল।
স্টেডিয়ামের গ্যালারি পরিণত হয়েছিল হলুদ জার্সির এক উত্তাল সমুদ্রে। হাজার হাজার কলম্বিয়ান সমর্থক ঐতিহ্যবাহী ‘সোমব্রেরো ভুয়েলতিয়াও’ হ্যাট দিয়ে গরমের হাওয়া নিতে নিতে পুরো গ্যালারি মাতিয়ে রেখেছিলেন আর সমস্বরে গাইছিলেন, ভ্যামোস কলম্বিয়া! এস্তা নোচে তেনেমোস কে গানার! যার অর্থ, এগিয়ে যাও কলম্বিয়া, আজ রাতেই আমাদের জিততে হবে)।
ম্যাচের শুরুতে অবশ্য কলম্বিয়ার জন্য বড় ধাক্কা ছিল ৮ম মিনিটে স্ট্রাইকার জন কর্ডোবার চোট পেয়ে মাঠ ছাড়া। তবে তাঁর বদলে মাঠে নামা লুইস সুয়ারেজই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন। ১৪ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে সুয়ারেজের বাড়ানো এক নিখুঁত ক্রস ঘানার ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে খুঁজে নেয় বক্সে সম্পূর্ণ আনমার্কড থাকা জন আরিয়াসকে। যথেষ্ট সময় ও জায়গা পেয়ে আরিয়াস অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বল ঘানার জালের কোনায় জড়িয়ে দলকে এনে দেন কাঙ্ক্ষিত লিড।

ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত কলম্বিয়ান মিডফিল্ডার গুস্তাভো পুয়ের্তা বলেন, এই মুহূর্তটি বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার নেই। এটি একটি স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো। আমরা প্রতিটা ম্যাচে দেখিয়েছি এই দলটি হৃদয় আর আত্মা দিয়ে ফুটবল খেলে। দলের সেরা তারকা লুইস দিয়াজও প্রথমার্ধে বেশ কিছু সুযোগ পেয়েছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আরিয়াসের ক্রস থেকে তিনি বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। দিয়াজ বলেন, আমাদের পা মাটিতেই রাখতে হবে। শান্ত থেকে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়াই আসল কথা।” ম্যাচের শেষ দিকে কলম্বিয়া ব্যবধান বাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেও ঘানার গোলরক্ষক লরেন্স আতি-জিগি একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে ব্যবধান বাড়তে দেননি।
অন্যদিকে ঘানার আক্রমণভাগের প্রধান ভরসা আন্টোনি সেমেনিও কলম্বিয়ার সুশৃঙ্খল ডিফেন্সের সামনে দাঁড়াতেই পারেননি। ম্যাচ শেষে পরাজয় মেনে নিয়ে ঘানার পর্তুগিজ কোচ কার্লোস কুইরোজ অকপটে স্বীকার করেন, ওরাই ম্যাচটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। ওদের পাসিং আর মুভমেন্ট আমাদের ক্লান্ত করে দিয়েছিল। আমরা চেষ্টা করেছি কিন্তু শেষ পাসগুলো নিখুঁত ছিল না। তাই বলতেই হয়, যোগ্য দল হিসেবেই ওরা জিতেছে।

এই জয়ের ফলে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এবং জার্মানিকে স্তব্ধ করে দেয়া প্যারাগুয়ের পর চতুর্থ দক্ষিণ আমেরিকান দেশ হিসেবে শেষ ১৬ নিশ্চিত করল কলম্বিয়া। আগামী মঙ্গলবার ভ্যাঙ্কুভারে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তারা মুখোমুখি হবে সুইজারল্যান্ডের।
উল্লেখ্য, এই ম্যাচটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক অনন্য নজির গড়েছে; যেখানে ম্যাচের প্রথম ১৫ মিনিটের মধ্যেই চোটের কারণে দুই দলই তাদের প্রথম খেলোয়াড় বদল করতে বাধ্য হয় (কলম্বিয়ার কর্ডোবা ৮ম মিনিটে এবং ঘানার রাইট-ব্যাক মারভিন সেনায়া ১৩তম মিনিটে হ্যামস্ট্রিং চোট নিয়ে মাঠ ছাড়েন)। দক্ষিণ আমেরিকার এই ‘ডার্ক হর্স’রা এখন সুইস বধের ছক কষতে ব্যস্ত!
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
