প্রেমের নাম বেদনা- যুগ যুগ ধরে গানে গল্পে কবিতায় এই কথা বলে আসছেন শিল্পী-সাহিত্যিকরা। তবে এতদিন এটিকে স্রেফ মানসিক যন্ত্রণা বলেই মনে করা হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে বিচ্ছেদের শারীরিক প্রভাব নিয়েও কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের ধারণা, বিচ্ছেদ শুধু মানসিক পীড়াই দেয় না, বরং শরীরের ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে যায়।
সম্প্রতি বিচ্ছেদের ভেতর দিয়ে যাওয়া মানুষের মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ নিয়ে গবেষণা করছেন জৈবিক নৃতত্ত্ববিদ হেলেন ফিশার। তার গবেষণায় দেখা গেছে, বিচ্ছেদের পর মানুষের মস্তিষ্কের সেই অংশ ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে, যেটিকে সাধারণত মাদকাসক্তির সাথে সম্পর্কিত বলে ধরা হয়।
ড্রাগ ও অ্যালকোহলে আসক্ত মানুষ এসব ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা করলে যে রকম যন্ত্রণা পান, প্রত্যাখ্যাত হলেও মানুষ সেই যন্ত্রণা অনুভব করে। এমনকি, সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরও তারা সময়ে সময়ে আবার নতুন করে পুরনো যন্ত্রণা অনুভব করতে পারেন। এ থেকে বোঝা যায়, এটিও এক ধরণের ক্লিনিক্যাল সমস্যা।
তবে প্রেমে পড়ার সময় নিয়ে এখন পর্যন্ত শতশত গবেষণা হলেও, বিচ্ছেদের এই ক্লিনিক্যাল দিক নিয়ে কেনো তেমন কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয় না কেনো?
লেখক ফ্লোরেন্স উইলিয়ামসের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের জিনোম প্রতিলিপি নির্ণয়ের প্রক্রিয়া আরও আধুনিক হয়েছে। মানুষ বিচ্ছেদকে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ‘মেলোড্রামা’ হিসেবে দেখেই অভ্যস্ত। তবে এটি শুধু মেলোড্রামা নয়, বিচ্ছেদ মানুষের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। সুতরাং মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য এটিকে গুরুত্বের সাথে দেখা জরুরি।
জিনোমিকস গবেষক স্টিভ কোল হৃদয় ভেঙে যাওয়ার অভিজ্ঞতাকে বলেছেন মানব অস্তিত্বের লুকায়িত স্থলমাইন। সম্পর্কের গভীরে সযত্নে লুকানো থাকে এগুলো, যা অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়।
বিচ্ছেদ ও মর্মবেদনার শারীরিক প্রভাবের মধ্যে রয়েছে ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক উদ্বেগ, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, বিষণ্ণতা ও অকাল মৃত্যু।
মন ভাঙার অদ্ভুত এই বেদনাকে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বিশ্লেষণের ফল বিচ্ছেদ নিয়ে সৃষ্ট শিল্পকর্মের মতই কাব্যিক। আগুনে পুড়লে মানুষ মস্তিষ্কের যে অংশ দিয়ে ব্যথা পায়, প্রেমে আঘাত পেলেও ব্যথা পায় সেই একই অংশ। আগুনে পোড়া মানুষ ধোঁয়া দেখলে যে ভয় পায়, প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিও একই ভয় অনুভব করে।

যে বিষয়টি ফ্লোরেন্স উইলিয়ামসকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে তা হলো- হৃদয় ভাঙার বিভিন্ন প্রভাব যেভাবে মানুষের শরীরে সংরক্ষিত হয়। মন ভাঙার সাথে যেসব অনুভূতি জড়িত- শোক, একাকিত্ব, উদ্বেগ- এর সবই মানুষের নার্ভাস সিস্টেম ও ইমিউন সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করে।
‘আমাদের কোষগুলো একাকিত্বের কথা শুনতে কান পেতে থাকে। এ থেকে বোঝা যায় কষ্টকর বিচ্ছেদের ভেতর দিয়ে যাওয়া মানুষের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি কেনো, বিশেষ করে তারা যদি এই আবেগগুলো ঠিকমতো প্রক্রিয়াজাত না করেন’, বলেন ফ্লোরেন্স উইলিয়ামস।
বিচ্ছেদ পরবর্তী সময়ে মানুষের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যেসব প্রভাব দেখা গেছে-
•মানব মস্তিষ্কের যে অংশে শারীরিক ব্যথা অনুভূত হয় তার নাম অ্যান্টেরিওর ইনসুলা ও অ্যান্টেরিওর সিঙ্গুলেট কর্টেক্স। বিচ্ছেদ এবং প্রত্যাখ্যানও মানুষের মস্তিষ্কের এসব অংশকে উদ্দীপিত করে, অর্থাৎ শরীরের কোথাও ব্যথা পেলে মানুষ যে ধরণের কষ্ট অনুভব করেন বিচ্ছেদের পর ও প্রত্যখ্যাত হলেও সেই একই রকমের ব্যথা অনুভব করেন।
•মাদকাসক্তির ফলে মস্তিষ্কের যেসব অংশ উদ্দীপিত হয়, সাবেক পার্টনারের ছবি দেখলেও সেসব অংশ একইভাবে উদ্দীপিত হয়। মাদক না পেলে মাদকাসক্ত ব্যক্তি যেরকম যন্ত্রণা পান, ভালোবাসার মানুষটিকে কাছে না পেলেও সেই ধরণের কষ্ট অনুভূত হয়।
•রক্তের কিছু কিছু শ্বেতকণিকা নার্ভাস সিস্টেমের মাধ্যমে মানুষের মেজাজ পর্যবেক্ষণ করে। কোনো মানুষ হৃদয় ভাঙা ও একাকিত্ব বোধ করলে এসব শ্বেতকণিকা তা বুঝতে পারে, ফলে রক্তে প্রদাহের সৃষ্টি হয়।
•'ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম'-এর ফলে হৃৎপিণ্ডের বাম প্রকোষ্ঠ আকৃতি পরিবর্তন করে আকারে বড় হয়ে যায়। এর ফলে এটি দুর্বল হয়ে পড়ে ও ঠিকমতো রক্ত সরবরাহ করতে পারে না।
•বিচ্ছেদের পর মানুষের শরীরে ভালো অনুভূতির নিউরোকেমিক্যাল ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের অভাব দেখা দেয়। এর ফলে শরীর কাঁপা, বুক ধড়ফড় করা ও বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে।
নিজের বই ‘হার্টব্রেক: অ্যা পার্সোনাল এন্ড সায়েন্টিফিক জার্নি’তে ফ্লোরেন্স উইলিয়ামস বলেছেন কীভাবে তিনি বিচ্ছেদের ক্ষত সারিয়ে তুলেছেন। এ প্রক্রিয়াকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন তিনি- শান্ত হওয়া, যোগাযোগ স্থাপন করা ও লক্ষ্য খুঁজে বের করা।
প্রকৃতির সাথে সময় কাটিয়ে, থেরাপিস্টের কাছে গিয়ে ও পরে একটি সুখী সম্পর্কে নিজেকে জড়িয়ে ধীরে ধীরে বিচ্ছেদের ট্রমা থেকে বের হয়ে আসেন তিনি।
আরও পড়ুন: জাপানিদের স্লিম বা ফিট থাকার যত সব রহস্য
বাঙালি কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন- ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে/ বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!’। কষ্টের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে কেউ পছন্দ না করলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, কষ্টকে গভীরভাবে অনুভব করাই হৃদয়ের ক্ষত সারিয়ে তোলার উপায়।
ভালোবাসার অভিজ্ঞতা মানুষকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে, যার ফলে আনন্দ ও বেদনা দুটোই মানুষ আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে। গান, থেরাপি বা বন্ধু- যে মাধ্যমেই হোক না কেনো, মর্মবেদনাকে ভেতর থেকে অনুভব করে এর থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে তা পরবর্তী সময়ে মানুষকে আরও বুদ্ধিমান ও উন্নত ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলে।
একাত্তর/এসজে
