এক সময় আরব লীগের চক্ষুশূল ছিলো লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ'। তবে, সময় পাল্টেছে, বাতাস বইছে স্রোতের বিপরীতে, তাদের ওপরই আস্থা বাড়ছে আরব লীগের। আর তাই তো পশ্চিমাদের মুখে ছাই দিয়ে এবার হিজবুল্লাহ'র সাথে মিত্রতা চাইছে আরব লীগ।
লেবাননের সশস্ত্র ইসলামি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে আরব বিশ্বের দেশগুলোর জোট আরব লীগ। জি ঠিকই শুনেছেন?
আরব লীগের সহকারী মহাসচিব ও মিসরীয় কূটনীতিক হোসাম জাকি প্রতিরোধ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সংসদীয় উপদলের নেতা মোহাম্মদ রাদের সঙ্গে বৈরুতে শনিবার এক বৈঠকের পর ওই ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এ ঘোষণায় এখনও নীরব রয়েছে পশ্চিমা গণমাধ্যম।
জাকি বলেন, হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর ওপর থেকে সন্ত্রাসী সংগঠনের নাম তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আরব লীগ। কারণ, এই গোষ্ঠীটি বর্তমান রাজনীতি ও লেবাননের ভবিষ্যতের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

আরব বিশ্বের দেশগুলো নিয়ে গঠিত আরব লীগ। টেলিভিশনে এক ভাষণে জোটের সেক্রেটারি জেনারেল হোসসাম জাকি বলেন, হিজবুল্লাহ এখন থেকে আর সন্ত্রাসী সংগঠন নয়। লীগের আগের সিদ্ধান্ত অনুসারে হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
আর এই সিদ্ধান্তের কারণেই সংসগঠনটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলো একমত হয়েছে যে, হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আর বিবেচনা করা উচিত নয়। জোট সদস্য রাষ্ট্র ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের সব শর্ত পূরণ করা হয়েছে বলেও জানান জাকি।
২০১৬ সালের ১১ মার্চ হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকাভুক্ত করে আরব লীগ। ওই বছর সৌদি আরবের উদ্যোগে শিয়া মতাবলম্বী গোষ্ঠীটিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা দেয় আরব লীগ। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি ইরাক, ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া ও আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের জন্য হিজবুল্লাহকে তখন দায়ী করা হয়।
সিদ্ধান্তটি আরব লিগের রেজ্যুলেশনেও প্রতিফলিত হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগও ছিন্ন করা হয়। কেন হিজবুল্লাহ'র বিরুদ্ধে গিয়েছিল আরব লীগ?
হিজবুল্লাহ ১৯৮২ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হিজবুল্লাহর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিলো লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলের দখলদারিত্বের অবসান ঘটানো এবং তারা ২০০০ সালে ওই লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হয়। হিজবুল্লাহ ছিল প্রথম গ্রুপ যাদের ইরান সমর্থন দেয় এবং তাদের রাজনৈতিক ইসলামবাদকে প্রসারিত করার উপায় হিসাবে ব্যবহার করেছিল।
হিজবুল্লাহ আরব বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আধা-সামরিক বাহিনী, যার রয়েছে শক্তিশালী একটি অভ্যন্তরীণ সাংগাঠনিক কাঠামো আর একটি বড় অস্ত্রাগার রয়েছে। ইসরাইল হিজবুল্লাহকে তার প্রতি সবচেয়ে সরাসরি হুমকি হিসাবে দেখে এবং অনুমান করে যে তাদের কাছে প্রেসিশন গাইডেড বা নির্ভুলভাবে-নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্রসহ ১ লাখ ৫০ হাজার রকেট এবং ক্ষেপণাস্ত্রের একটি অস্ত্রাগার রয়েছে।

প্রথম দিকে এই গোষ্ঠীটি আমেরিকার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, ফলে ওয়াশিংটন হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত করে। আর ইসরায়েলের মিত্র পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের ফলে আরব লীগও একসময় তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে।
তবে এখন বদলেছে পরিস্থিতি। আরব লীগের দৃষ্টিকোণ থেকে এখন হিজবুল্লাহ এখন মুসলিম বিশ্বের হয়ে ইসরাইলকে মোকাবিলা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহ যেভাবে ইসরায়েল ও গাজায় গণহত্যা বন্ধে ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে তা আরব দেশগুলোর জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এ বিষয়টিই হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য জোটকে উদ্বুদ্ধ করেছে।
গত বছরের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলি অভিযান শুরুর পর থেকে একাধিকবার লেবানন সীমান্তে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। দুই দেশই সীমান্ত থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নিয়েছে। লেবাননের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ কাছে। তারা বেশ কয়েকবার হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইসরাইলের সাথে সংঘাতে এখন পর্যন্ত শতাধিক যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। একই সময়ে লেবাননের কয়েকজন বেসামরিক নাগরিকও ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
সংঘাতের তীব্রতা কম থাকলেও গত কয়েক মাস ধরে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই উত্তেজনা নতুন করে তীব্রতা পেয়েছে। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
