আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্তে চলমান উত্তেজনা চরমে উঠেছে। রোববার (১২ অক্টোবর) সকাল থেকে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। আফগান তালেবান সরকার দাবি করেছে, তারা ৫৮ জন পাকিস্তানি সৈনিককে হত্যা করেছে। এর জেরে পাকিস্তান সীমান্তের প্রধান ক্রসিংগুলো বন্ধ ঘোষণা করেছে। খবর রয়টার্সের।
এই সংঘর্ষের মূলে রয়েছে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কাবুলে বিমান হামলা, যা তালেবান ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন’ বলে অভিযোগ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উভয় পক্ষকে সংযমের আহবান জানিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) কাবুলে দুটি বিস্ফোরণ ঘটে, যা পাকিস্তানি গোয়েন্দা সূত্র অনুসারে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) নেতাকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে। ইসলামাবাদ এটি অস্বীকার করলেও আফগানিস্তান এতে সিভিলিয়ান ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ তুলেছে।
পরে শনিবার রাত থেকে আফগান সেনারা পাকিস্তানি সীমান্ত পোস্টগুলোতে হামলা চালায়। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এতে ৫৮ জন পাক সৈনিক নিহত এবং ২০ জন আফগান সেনা আহত বা নিহত হয়েছে। তারা দাবি করেছে, পাকিস্তানি পোস্টগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।
প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা আগ্নেয়াস্ত্র এবং কামান হামলায় প্রত্যুত্তর দিয়েছে। তাদের দাবি, ২৩ জন পাক সৈনিক নিহত হলেও দুইশ’র বেশি তালেবান যোদ্ধা মারা গেছে এবং ১৯টি আফগান পোস্ট দখল করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজে আফগান পোস্টে হামলার দৃশ্য দেখা গেছে।
সংঘর্ষটি কুর্রাম, বাজৌর, আংগুর আদ্দা, খারলাচি, ঘুলাম খানসহ একাধিক স্থানে সীমান্তবর্তী এলাকায় চলছে। স্থানীয়রা জানিয়েছে, রোববার সকালে যুদ্ধবিরতি হলেও কুর্রামে গুলিবর্ষণ চলছে।
আফগান তালেবানের স্পোকসম্যান জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, ইসলামিক এমিরাত এবং আফগান জনগণ তাদের ভূমি রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, কিছু এলাকায় লড়াই চলছে।
পাকিস্তান রোববার সীমান্তের প্রধান দুটি ক্রসিং-টর্কহাম এবং চামানবন্ধ ঘোষণা করেছে। এছাড়া খারলাচি, আংগুর আদ্দা এবং ঘুলাম খানসহ তিনটি ছোট ক্রসিংও বন্ধ। আফগানিস্তানের দুই হাজার ৬০০ কিলোমিটার লম্বা সীমান্তের সঙ্গে এটি বাণিজ্য এবং যাতায়াতে বড় ধাক্কা। শত শত ট্রাক আটকে আছে, যা অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আফগানিস্তান, যা ভূ-অবরুদ্ধ দেশ, এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কাতার ও সৌদি আরব উভয় দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করে আফগানিস্তানকে হামলা বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছে। তালেবান এই অনুরোধ মেনে নিয়ে অপারেশন স্থগিত করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং উভয় পক্ষকে সংযমের আহবান জানিয়েছেন।
ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিবিদ কে.পি. ফ্যাবিয়ান বলেছেন, পাকিস্তানের বিদেশনীতি ব্যর্থতা এবং এতে ৬৫-এর বেশি লোক নিহত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এটিকে ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে, যাতে সীমান্ত অস্বীকৃতি এবং মিলিট্যান্ট গ্রুপের ভূমিকা জটিলতা বাড়িয়েছে।
পাকিস্তান তালেবান সরকারকে টিটিপি মিলিট্যান্টদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে, যা অস্বীকার করেছে কাবুল। এই সংঘর্ষ ২০২৪ সাল থেকে চলমান সীমান্ত উত্তেজনার অংশ, যাতে ড্রোন হামলা এবং ছোটখাটো সংঘর্ষ ঘন ঘন ঘটছে।
এই সংঘর্ষ দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, টিটিপি'র মতো গ্রুপগুলো এতে লাভবান হতে পারে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুমকি দিয়েছেন, যখন আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কিছু গ্রুপ পাকিস্তান থেকে পরিস্থিতি নষ্ট করছে।
গাজায় এক ডজন ত্রাণবাহী ট্রাক, খুলছে বন্দী মুক্তির নতুন দুয়ার