মিশেল ওবামার নতুন বই ‘দ্য লুক’ প্রকাশের পর আবারো আলোচনা শুরু হয়েছে— হোয়াইট হাউসের ফার্স্ট লেডিদের পোশাক কেনো এত গুরুত্বপূর্ণ? তারা কি শুধুই ‘জাতির মা’, নাকি ফ্যাশনের আড়ালে রাজনীতি ও ক্ষমতার বার্তা বহনকারী?
'দ্য লুক’ বইটির ভূমিকা নিয়ে আফ্রিকান-আমেরিকান স্টাডিজের অধ্যাপক ফারাহ জেসমিন গ্রিফিন লিখেছেন, ‘লুকটি, ঠিক যেমন নারীটি, ছিল সাহসী, শক্তিশালী, ভবিষ্যৎমুখী, দূরদর্শী এবং ক্ষমতায়নকারী।'
এই বাক্যগুলোই যেন বলে দেয়, একজন ফার্স্ট লেডির পোশাক কেবল সৌন্দর্য নয় বরং একটি আদর্শ, একটি যুগের প্রতীক।
দীর্ঘদিনের স্টাইলিস্ট, মেকআপ আর্টিস্ট এবং হেয়ারস্টাইলিস্টদের কণ্ঠস্বর ধারণ করা এই বইটির মাধ্যমে হোয়াইট হাউসের ব্রোচ, বল গাউন এবং বর্তমান সময়ের ‘ডাবল ডেনিম’ -এর পেছনের গল্প সামনে এসেছে।
২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ফার্স্ট লেডি থাকা মিশেল ওবামা সম্প্রতি ‘গুড মর্নিং আমেরিকা’ -কে জানিয়েছেন, তিনি যা পরতেন, তা ছিলো সচেতন সিদ্ধান্ত। ওবামার ভাষায়, আমি সত্যিই ভেবেছিলাম আমি আমার ফ্যাশন দিয়ে কী বলতে চাই। আমি অন্তর্ভুক্তিমূলকতা, বৈচিত্র্য, সুযোগ উন্মোচনের কথা বলতে চেয়েছিলাম এবং ফ্যাশন ছিলো সেই সরঞ্জামগুলোর একটি যা আমাকে তা করতে সাহায্য করেছিল।
পোশাক যখন ‘অ-লিখিত সাংবিধানিক’ দায়িত্ব
মার্কিন প্রেসিডেন্টের জীবনসঙ্গী যা পরেন, তা কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়। ১৭৮৯ সালে মার্থা ওয়াশিংটনের সময় থেকেই ফার্স্ট লেডিদের পোশাক মুগ্ধতা ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঐতিহাসিকরা বলছেন, যদিও তাদের স্বামীর পদমর্যাদা ছিলো; ফার্স্ট লেডিদের পোশাক কখনো কখনো অত্যন্ত রাজনৈতিক ছিলো—বিদেশে কূটনীতির কৌশল কিংবা দেশে আস্থার প্রদর্শন।

ঐতিহাসিক এবং ‘ড্রেসড ফর ফ্রিডম’ গ্রন্থের লেখক এইনাভ রাবিনোভিচ-ফক্স বিবিসিকে জানান, মার্কিন সংবিধানে ফার্স্ট লেডির ভূমিকার উল্লেখ না থাকলেও, এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গার্হস্থ্য (হোস্টেস) ভূমিকা থেকে আরো পেশাদার এবং রাজনৈতিক দিকে বিবর্তিত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে এলিয়েনর রুজভেল্ট (১৯৩৩-১৯৪৫) এই ভূমিকাকে এক বিশাল রাজনৈতিক মাত্রা দেন।
মিশেল ওবামার কথায়, ফার্স্ট লেডির ভূমিকা এক ধরনের ‘চাকরি, অ-চাকরি’। আপনাকে একইসঙ্গে অনুপ্রেরণাদায়ক হতে হবে, কিন্তু সহজলভ্য; অনন্য হতে হবে, আবার প্রতিনিধিত্বমূলকও। এই জটিল কাজটির প্রতি পদে পদে পোশাক একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।
ফার্স্ট লেডিরা যুগে যুগে তাঁদের পোশাকের মাধ্যমে কীভাবে তাঁদের দর্শন ও সময়কে তুলে ধরেছেন, তার একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ এখানে:
মার্থা ওয়াশিংটন

প্রথম ফার্স্ট লেডি মার্থা ওয়াশিংটনই এই পদের ভিত্তি তৈরি করেন। রাজকীয়তা এড়িয়ে চলতে তিনি ১৭৭৬ সালের বিপ্লবী যুদ্ধের আগে থেকেই শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি দেশীয় কাপড় পরতেন।
রাষ্ট্রপতি ঐতিহাসিক ফেদার ফস্টারের মতে, এটি ছিল তার দেশপ্রেমের কর্তব্য। তার মাতৃত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাপূর্ণ স্টাইল তাকে ‘জাতির মা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল।
ডলি ম্যাডিসন

১৮০৯ থেকে ১৮১৭ সাল পর্যন্ত ফার্স্ট লেডি ডলি ম্যাডিসন ছিলেন সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ‘ফ্যাশনিস্তা’। টারবান-স্টাইলের হেডড্রেস এবং সাহসী ডেকোলেতে পোশাকের মাধ্যমে তিনি ফ্যাশন ট্রেন্ড সেট করতেন। তবে তার এই বিলাসবহুল রুচি ছিলো অত্যন্ত রাজনৈতিক।
বহির্মুখী ও কৌশলী ডলি তার ফ্যাশন ও আকর্ষণ দিয়ে নীরস স্বামী জেমস ম্যাডিসনের প্রশাসনের জন্য জনসমর্থন আনতে সাহায্য করতেন।
ম্যামি আইজেনহাওয়ার

১৯৫৩ থেকে ১৯৬১ সালের ফার্স্ট লেডি ম্যামি আইজেনহাওয়ার ১৯৫০-এর দশকের রক্ষণশীল গৃহিণী আদর্শের প্রতিচ্ছবি ছিলেন। যুদ্ধের পর তিনি আমেরিকান নারীদের ঘরে ফেরার ধারণাকে শক্তিশালী করেন।
তার গোলাপি রঙের (ম্যামি পিঙ্ক) প্রতি ভালোবাসা ছিলো সে সময়ের স্থির লিঙ্গ ভূমিকা এবং শীতল যুদ্ধের রক্ষণশীলতার প্রতীক।
জ্যাকি কেনেডি

জ্যাকি কেনেডি নিঃসন্দেহে ফার্স্ট লেডিদের স্টাইলের জন্য ‘সোনালি মানদণ্ড’ স্থাপন করেছিলেন। তার তীক্ষ্ণ স্যুট এবং পিলবক্স হ্যাট আজও আইকনিক। তিনি ছিলেন প্রথম ফার্স্ট লেডি যিনি ফ্যাশনকে শুধু নিজের ভাবমূর্তি নয়, বরং কূটনীতির একটি রূপ হিসেবে ব্যবহার করেন।
ইউরোপীয় ডিজাইনের প্রতি তার আগ্রহ মার্কিন প্রেসিডেন্সিতে গ্ল্যামার ও আন্তর্জাতিকতার নতুন যুগের সূচনা করেছিল।
ন্যান্সি রিগান

১৯৮০-এর দশকের সমৃদ্ধির প্রতীক ছিলেন ন্যান্সি রিগান। তার নিখুঁত, উচ্চ-ফ্যাশন লুকে ছিল চ্যানেল, ভ্যালেন্টিনোসহ নামিদামি ডিজাইনারদের ছোঁয়া। তিনি ছবির শক্তি বুঝতেন।
তিনি লাল রঙের প্রতি ভালোবাসার জন্য বিখ্যাত ছিলেন, যা ‘রিগান রেড’ নামে পরিচিতি পায়। তবে অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে তার বিলাসবহুল রুচি সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।
হিলারি ক্লিনটন

জননীতিতে ফার্স্ট লেডিদের জড়িত থাকার নজির স্থাপন করেছিলেন হিলারি ক্লিনটন (১৯৯৩-২০০১)। তার পেশাদার ট্রাউজার স্যুটগুলো ছিলো এই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পোশাকগত প্রতিফলন।
তিনি তার অফিসিয়াল পোর্ট্রেটে প্যান্টস্যুট পরা প্রথম ফার্স্ট লেডি। হেডব্যান্ড পরিধান করে তিনি তার কাজে-নামার মনোভাবের সংকেত দিতেন।
মিশেল ওবামা

জ্যাকির মতো তিনিও শুরুতেই স্টাইল আইকন হন। তবে তার পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে হোয়াইট হাউসে আসা ওবামা ‘টার্গেট’ বা ‘জে ক্রু’-এর মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ড পরে সহজলভ্য ছবি তুলে ধরেন। তিনি তরুণ আমেরিকান ডিজাইনারদের সমর্থন করতেন, যা তার অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক এজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়েছিল।
তবে কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে তার চুল (ব্রেইড পরিহার) এবং পোশাক (খোলা বাহু) নিয়ে সমালোচনা ছিলো, যা তিনি ‘ভণ্ডামি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার মতে, পোশাক কখনো আমার বলার কিছুর চেয়ে জোরে কথা বলতে পারবে না।
মেলানিয়া ট্রাম্প

মেলানিয়া ট্রাম্পের সামরিক ধাঁচের টেইলরিং, ট্রেঞ্চকোট এবং টাক্সিডোর স্টাইল ছিলো অত্যন্ত গ্ল্যামারাস। প্রাক্তন মডেল হওয়ায় তিনি খুব ভালো জানতেন কীভাবে পোশাক ব্যবহার করতে হয়।
সমালোচকদের মতে, তিনি যেহেতু খুব কম কথা বলতেন, তাই তার ফ্যাশন পছন্দগুলোই ছিল তার কথা বলার রূপ। ২০১৮ সালে শিশু অভিবাসী আটক কেন্দ্রে পরিদর্শনে তার জ্যাকেটে লেখা ‘আমি সত্যিই চিন্তা করি না। তুমি করো?’ বার্তাটি ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।
ঐতিহাসিক রাবিনোভিচ-ফক্সের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আধুনিক ফার্স্ট লেডিরা ফ্যাশনের শক্তি বোঝেন এবং এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি করতে চান, যা দেশকে প্রতিনিধিত্ব করবে, পাশাপাশি নিজেদের ও স্বামীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেও তুলে ধরবে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র যখন তার ‘ফার্স্ট জেন্টলম্যান’ পাবে, তখন এই ‘ফ্যাশন-কূটনীতির’ গতিশীলতা কীভাবে পরিবর্তিত হয় এখন তাই দেখার বিষয়।
সকালে না রাতে, কখন গোসল করা ভালো?
স্থাপত্যশিল্প ও পৌরাণিক ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়া কান্তজিউ মন্দির
যেসব কারণে সবচেয়ে দ্রুত ছুটতে পারে চিতা
বাঁশ-মাটি-খড়ের ‘শান্তির স্কুল’
সুইস পাহাড়ের গভীরে মহাকাশচারীদের স্কুল