দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড়ো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঊর্ধ্বমুখী খেলাপি ঋণ। এতদিন কৃষি খাতের ঋণে এই ভূতের আতঙ্ক কম থাকলেও নতুন করে সেখানেও খেলাপির ভূত চেপে বসেছে। যদিও ব্যাংকাররা বলছেন, এই খাতের বিশেষ সুবিধা তুলে নেওয়ায় সমস্যাগ্রস্ত ঋণ বাড়ছে। তবে দ্রুতই এটি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলেও জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আগে কৃষি খাতের ঋণের ক্ষেত্রে সাব-স্ট্যান্ডার্ড হতে সময় লাগতো এক বছর, ডাউটফুলে ৩ বছর এবং মন্দমানে খেলাপি হতে সময় লাগতো ৫ বছর। কিন্তু নতুন নীতিমালায় এই ঋণ ৩-৬ এবং ১২ বছরের মধ্যে খারাপ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই নীতি গত জুন মাসে কার্যকর করা হয়েছিলো। এরপর থেকেই খেলাপি ঋণ গণহারে বাড়ছে। চলতি বছরের মার্চে কৃষি ঋণে খেলাপি ছিলো ৯ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা, যা ছিলো মোট ঋণের ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিতরণ হওয়া ঋণের ৩৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর ২০২৪ সালের জুনে এই ঋণের পরিমাণ ছিলো মাত্র ৫ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা বা ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী একাত্তরকে বলেন, যে সব ঋণ আগে সাব স্ট্যান্ডার্ড (খেলাপির প্রথম ধাপ) হতে ১ বছর সময় লাগতো সেগুলো এখন ৩ মাসের মধ্যেই খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। আমরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ডকে অনুসরণ করার কারণেই নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এজন্য সাময়িকভাবে খেলাপি বেড়ে গেছে। তবে দ্রুতই এটা কমে যাবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে অনুসরণ করেই কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের নীতি সহায়তায় নিয়ে আসবে। যাতে কৃষকরা কোনো ধরনের সমস্যার মধ্যে না পড়েন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে বিতরণ হওয়া কৃষি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ২০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিতরণ হওয়া ঋণের ৩৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। অক্টোবর পর্যন্ত কৃষি ঋণে খেলাপির দিকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে রাষ্ট্রের অর্থে গঠিত ৯টি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের কৃষি খাতের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৪৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অক্টোবর পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা।
এসব ঋণের মধ্যে ১ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা খেলাপি যা মোট ঋণের ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। আর এই খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ৯৭০ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের কোনো খেলাপি নেই।
তথ্য বলছে, কৃষি খাতে টাকার অঙ্কে ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। প্রতিষ্ঠানটির কৃষি খাতের বিতরণ পরিমাণ ২১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ১২ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। এর পরের অবস্থান আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। ব্যাংকটির বিতরণ করা কৃষি ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ১২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ৩ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে খেলাপিতে তৃতীয় অবস্থানে রাষ্ট্রের বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১ কোটি টাকা। অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকটি বিতরণ করেছে ২ হাজার ৪৫১ কোটি টাকার কৃষি ঋণ। চতুর্থ অবস্থানে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৭১৬ কোটি টাকা। অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকটি বিতরণ করেছে ৩ হাজার ১০৯ কোটি টাকার কৃষি ঋণ।
পঞ্চম অবস্থানে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ৫৩০ কোটি টাকা। ব্যাংকটি কৃষি খাতে বিতরণ করেছে ২ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। ষষ্ঠ অবস্থানে আছে ন্যাশনাল ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ২৪২ কোটি টাকা। আর অক্টোবর পর্যন্ত কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে ৩৭৫ কোটি টাকা। আর সপ্তম অবস্থানে থাকা রুপালি ব্যাংকের খেলাপি ২২৪ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি গত অক্টোবর পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করেছে ৫৭৯ কোটি টাকা। আর অষ্টম অবস্থানে রয়েছে এক্সিম ব্যাংক। একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকটির খেলাপি ১৫৮ কোটি টাকা। অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির বিতরণ করা কৃষি ঋণের পরিমাণ ৪৬৭ কোটি টাকা। নবম অবস্থানে থাকা আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের বিতরণ করা ৭৫১ কোটি টাকার কৃষি ঋণের ১৪৫ কোটি টাকা খেলাপি। আর দশম অবস্থানে থাকা এবি ব্যাংকের ২২৯ কোটি টাকার কৃষি ঋণের মধ্যে ১২৬ কোটি টাকা খেলাপি।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, শতাংশের হিসাবে খেলাপিতে শীর্ষে অবস্থান করছে শরীয়াহ ভিত্তিক ইউনিয়ন ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির কৃষি খাতে বিতরণ করা ঋণের ৯০ দশমিক ২৪ শতাংশই খেলাপি। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক, যার খেলাপির হার ৬৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এরপরই অবস্থান রাষ্ট্রের বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপির হার ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর ৪র্থ ও পঞ্চম অবস্থানে আছে যথাক্রমে ফার্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (৫৫.২২) ও এবি ব্যাংক (৫৫.১৩)।
এছাড়া তালিকায় আছে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (৪২.৪২), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (২১.২৩), রূপালি ব্যাংক (৩৮.৬৫), সোনালী ব্যাংক (৩৬.৮৩), এক্সিম ব্যাংক (৩৩.৮৫), বাংলাদেশ কমার্স (৩০.৩৯), সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (২৫.৩৮), আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক (১৯.৩৭) এবং আইএফআইসি ব্যাংক (১৪.২৯)। এছাড়া বিডিবিএল (২৬.৯৬) জনতা (২৩.০৫), অগ্রণী (১৮.২৪), বেসিক (১৬.৬৪)।
সার্বিক বিষয়ে গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি একাত্তরকে বলেন, কৃষি খাতে খেলাপি যদি বৃদ্ধি পায় তাহলে ব্যাংকখাত তথা, উৎপাদন, রপ্তানি ও সমাগ্রিক মূল্যস্ফীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে। এজন্য দেশের খাদ্য ব্যবস্থার চালিকাশক্তি কৃষিকে অবশ্যই নীতি সহায়তার আওতায় আনা দরকার। কারণ আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষি সবচেয়ে বড়ো ভূমিকার রাখছে। সেক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহারসহ কৃষিকে আধুনিকায়নে বিভিন্ন সহায়তা স্কিম তৈরি করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছর ব্যাংকগুলো মোট ৩৯ হাজার কোটি টাকার কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
কাজে আসছে না নীতিসহায়তার দাওয়াই
মৌসুমি সবজির সরবরাহ বাড়ছে