যুদ্ধে রাশিয়ার কোটিপতিদের কীভাবে পাশে রেখেছেন পুতিন?

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:৫৬ পিএম

ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝে রাশিয়ায় বিলিয়নেয়ার বা শতকোটিপতির সংখ্যা সর্বকালের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে ভ্লাদিমির পুতিন গত ২৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে রাশিয়ার এই ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী- যাদের 'অলিগার্ক' বলা হয়, তাদের প্রায় সব রাজনৈতিক প্রভাব হারিয়েছেন।

রাশিয়ান প্রেসিডেন্টের জন্য এটি সুসংবাদই বটে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলো এই অতি-ধনীদের তার প্রতিপক্ষ বানাতে ব্যর্থ হয়েছে; বরং পুতিনের 'পুরস্কার ও তিরস্কার' নীতি একপ্রকার নীরব সমর্থকে পরিণত করেছে।

সাবেক ব্যাংকিং বিলিয়নেয়ার ওলেগ তিংকভ খুব ভালো করেই জানেন এই 'তিরস্কার' বা শাস্তির স্বরূপ কেমন। ইনস্টাগ্রামে যুদ্ধকে ‘পাগলামি’ বলে সমালোচনা করার ঠিক পরদিনই ক্রেমলিন থেকে তার ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তাকে সোজা জানিয়ে দেয়া হয় যে, তার ব্যাংক 'তিঙ্কফ' (তৎকালীন রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক) জাতীয়করণ করা হবে, যদি না তিনি এর মালিকানা ছেড়ে দেন।

যুদ্ধের সমালোচনা করার পর কোটি কোটি টাকা হারিয়ে রাশিয়া ছেড়ে চলে যান ওলেগ টিঙ্কভ।

নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তিংকভ বলেন, আমি দাম নিয়ে দরদাম করার সুযোগ পাইনি। পরিস্থিতি ছিল অনেকটা জিম্মি দশার মতো- যা দেয়া হচ্ছিল তাই নিতে বাধ্য হয়েছি। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ভ্লাদিমির পোতানিন—যিনি বর্তমানে রাশিয়ার পঞ্চম ধনী এবং যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিনের জন্য ব্যবহৃত নিকেল সরবরাহ করেন, তার মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংকটি কিনে নেয়। 

তিংকভের মতে, ব্যাংকটির প্রকৃত মূল্যের মাত্র ৩ শতাংশ দামে তাকে এটি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিংকভ তার ৯ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ হারিয়ে দেশ ছাড়েন।

পুতিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগের পরিস্থিতির সাথে এর পার্থক্য আকাশ-পাতাল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর অনেক রাশিয়ান রাষ্ট্রীয় বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার সেই সময়ে তাদের অগাধ প্রতিপত্তি ছিল। 

রাশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অলিগার্ক বরিস বেরেজোভস্কি দাবি করেছিলেন, ২০০০ সালে পুতিনের ক্ষমতায় আসার পেছনে তার হাত ছিল। যদিও ২০১২ সালে তিনি এর জন্য ক্ষমা চেয়ে লিখেছিলেন, আমি তার মধ্যে সেই লোভী স্বৈরাচারীকে দেখতে পাইনি যে কিনা স্বাধীনতা পদদলিত করবে। 

পুতিনের সমালোচনা করার পর যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে গিয়ে ২০১৩ সালে রহস্যজনকভাবে মারা যান বরিস বেরেজভস্কি।

এর ঠিক এক বছর পর যুক্তরাজ্যের নির্বাসনে রহস্যজনকভাবে বেরেজোভস্কির মৃত্যু হয়। ততদিনে রাশিয়ার অলিগার্কি বা ধনিকতন্ত্রের ক্ষমতাও মৃতপ্রায়।
তাই ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সর্বাত্মক হামলার নির্দেশ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর পুতিন যখন ক্রেমলিনে রাশিয়ার শীর্ষ ধনীদের তলব করেন, তখন তাদের প্রতিবাদ করার সামান্যতম সাহসও ছিল না। 

ধনীদের খোঁজ-খবর রাখা ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ১১৭ থেকে কমে ৮৩-তে দাঁড়িয়েছিল এবং তারা সম্মিলিতভাবে ২৬৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ হারিয়েছিলেন।

কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে দেখা গেল, পুতিনের 'যুদ্ধ অর্থনীতি'র অংশ হতে পারলেই বিপুল মুনাফা সম্ভব। ২০২৪ সালে দেখা গেছে, রাশিয়ার অর্ধেক বিলিয়নেয়ার হয় সরাসরি সামরিক খাতে সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছেন অথবা এই আগ্রাসনের ফলে লাভবান হয়েছেন। 

এক সময় রাশিয়ার সবচেয়ে ধনী মিখাইল খোদোরকভস্কিকে জেলে পাঠিয়ে তার তেল কোম্পানি জাতীয়করণ করা হয়।

এ বছর ফোর্বসের তালিকায় রাশিয়ার বিলিয়নেয়ার সংখ্যা সর্বোচ্চ ১৪০ জনে পৌঁছেছে। তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৫৮০ বিলিয়ন ডলার।

অনুগতদের মুনাফা করার সুযোগ দিলেও অবাধ্যদের কঠোর শাস্তি দিয়েছেন পুতিন। এক সময়ের রাশিয়ার শ্রেষ্ঠ ধনী মিখাইল খোদোরকভস্কির কথা কেউ ভোলেনি, যিনি গণতন্ত্রকামী সংগঠন করার অপরাধে ১০ বছর জেল খেটেছিলেন। যুদ্ধের পর থেকে প্রায় সব অতি-ধনীরাই চুপ হয়ে গেছেন। যারা বিরোধিতা করেছেন, তাদের সম্পদ ও দেশ দুটোই হারাতে হয়েছে।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলো আসলে পুতিনকে সহায়তা করেছে। ইউরোপীয় নীতি বিশ্লেষণ কেন্দ্রের গবেষক আলেকজান্ডার কলিয়ান্দ্র বলেন, পাশ্চাত্য এমন কোনো পথ খোলা রাখেনি যাতে বিলিয়নেয়াররা পক্ষ ত্যাগ করতে পারেন। সম্পদ জব্দ ও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার ফলে তারা উল্টো পুতিনের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য হয়েছেন।

এছাড়া পশ্চিমা কোম্পানিগুলো রাশিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, পুতিন-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা নামমাত্র মূল্যে সেই লাভজনক ব্যবসাগুলো কিনে নিয়েছেন। কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের আলেকজান্দ্রা প্রোকোপেনকো মনে করেন, এর ফলে পুতিনের একটি অনুগত ‘অনুসারী বাহিনী’ তৈরি হয়েছে, যাদের ভবিষ্যৎ এখন পশ্চিমের সাথে রাশিয়ার সংঘাতের ওপরই নির্ভরশীল।

সার-সংক্ষেপ হলো- যুদ্ধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও, কিংবা বলা ভালো নিষেধাজ্ঞার কারণেই, রাশিয়ার শীর্ষ ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ওপর নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন ভ্লাদিমির পুতিন।– বিসিসি। 

এআরএস
মস্কোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে বৃহস্পতিবার দক্ষিণ-পূর্ব মস্কোর একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে আবারও ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। গত তিন দিনের মধ্যে এটি মস্কোর জ্বালানি...
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্বাহী বোর্ডে উত্থাপিত যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী খসড়া প্রস্তাবকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক সংস্থায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত...
টানা পঞ্চম বছরে পদার্পণ করা ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে এক অভূতপূর্ব চাল চেলেছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সরাসরি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে উদ্দেশ্য করে একটি খোলা চিঠি...
ইতিহাস কীভাবে রঙ বদলায়, তার এক চরম ও অবিশ্বাস্য নিদর্শন দেখল বিশ্ববাসী। এক সময়ের চরম শত্রু থেকে এবার পরম মিত্রে পরিণত হলো রাশিয়া এবং আফগানিস্তানের শাসক দল তালিবান। আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান...
ইরানের ওপর মার্কিন বিমান হামলা জোরদার করার পাশাপাশি যুদ্ধের পরিধি আরও বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানকে নতি স্বীকার করাতে ওয়াশিংটনের এই সামরিক...
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে এক মাসের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি গত সপ্তাহে ভেস্তে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে, জর্ডানে...
আমেরিকার সাথে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কেন্দ্র করে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়েছে ইরান। দেশটির কট্টরপন্থীরা বর্তমান দৃশ্যমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক নীরব অভ্যুত্থান...
ঢাকায় কর্মরত কুমিল্লা জেলার সাংবাদিকদের সংগঠন ‘কুমিল্লা সাংবাদিক ফোরাম, ঢাকা’র (সিজেএফডি) নির্বাহী কমিটির নির্বাচন-২০২৬ সম্পন্ন হয়েছে। এতে সভাপতি পদে দৈনিক ইনকিলাবের বিশেষ প্রতিনিধি সাঈদ আহমেদ খান...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর