শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিক ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার জানিয়েছেন, তিনি আগামী সপ্তাহে ডেনমার্কের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। তবে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে লক্ষ্য, তা থেকে পিছু হটার কোনো ইঙ্গিত তিনি দেননি। অন্যদিকে, গ্রিনল্যান্ড দখলে ট্রাম্পের অভিলাষ বন্ধে ফ্রান্স ও জার্মানিসহ আতঙ্কিত মিত্র দেশগুলোর একটি সম্মিলিত জবাব তৈরির চেষ্টা করছে।
সপ্তাহান্তে মার্কিন সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার নেতাকে বন্দি করার ঘটনাটি গ্রিনল্যান্ডের ওপর মার্কিন সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারাও এই ভয় দূর করার জন্য বিশেষ কিছু করেননি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেছেন যে, ট্রাম্প তার উদ্দেশ্য হাসিলে সামরিক পথ বেছে নেয়ার বিকল্পটি খোলা রেখেছেন।
গ্রিনল্যান্ড জোরপূর্বক দখল করলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সামরিক জোট ঝুঁকির মুখে পড়বে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একজন কূটনীতিক হিসেবে আমরা সব সময় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথকে অগ্রাধিকার দিই, যা ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।
দীর্ঘদিনের মিত্র ডেনমার্কের কাছ থেকে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই আর্কটিক দ্বীপটি মার্কিন সামরিক বাহিনী দখল করে নিলে, তা ন্যাটো জোটে বড় ধরনের আঘাত হানবে এবং ট্রাম্পের সঙ্গে ইউরোপীয় নেতাদের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেবে। এই বিষয়টি মার্কিন কংগ্রেসেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের সিনেটররা বুধবার জানিয়েছেন, তারা ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের ক্ষমতা খর্ব করার লক্ষ্যে একটি আইনি প্রস্তাবের ওপর ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ট্রাম্পের দাবি: গ্রিনল্যান্ড মার্কিন নিরাপত্তার চাবিকাঠি
ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার মাঝে গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান কয়েক দশক ধরে একে মার্কিন ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এছাড়া এর খনিজ সম্পদ চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০১৯ সালে তার প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প প্রথম গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণের ধারণাটি সামনে আনেন।
তিনি যুক্তি দেন, গ্রিনল্যান্ড মার্কিন সামরিক কৌশলের জন্য অপরিহার্য এবং ডেনমার্ক এর সুরক্ষায় যথেষ্ট কাজ করেনি। যদিও ১৯৫১ এবং ২০২৩ সালে স্বাক্ষরিত দুটি চুক্তি অনুযায়ী ডেনমার্ক ইতিমধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে দ্বীপে প্রায় অবারিত প্রবেশের সুযোগ দিয়ে রেখেছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও হোয়াইট হাউস মঙ্গলবার জানিয়েছে, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাব্যতাসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন। তবে প্রশাসনের অন্য কেউ কেউ ভিন্ন পথের কথা বলছেন। সোমবার রাতে কংগ্রেসের নেতাদের জন্য আয়োজিত এক রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ে রুবিও জানিয়েছিলেন যে, তাদের মূল লক্ষ্য হলো দ্বীপটি কিনে নেওয়া।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বুধবার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা দল সক্রিয়ভাবে আলোচনা করছে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য সব পথই খোলা রয়েছে... তবে তার প্রথম পছন্দ সব সময়ই কূটনীতি।
প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককনেল, যার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই ট্রাম্পের বিরোধ বাঁধে, তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের হুমকি-ধমকি যতটা অশোভন, ততটাই হিতে বিপরীত। তিনি এক বিবৃতিতে আরও যোগ করেন, আমেরিকার অন্যতম অনুগত এবং সক্ষম মিত্রের সার্বভৌম গণতান্ত্রিক অঞ্চল দখলে শক্তি প্রয়োগ করা হবে আমেরিকার কৌশলগত এবং বৈশ্বিক প্রভাবের জন্য একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
গ্রিনল্যান্ডের পাশে ইউরোপ ও কানাডা
ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো এবং কানাডা এই সপ্তাহে গ্রিনল্যান্ডের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে। তারা বলছে, গ্রিনল্যান্ড শুধু সেখানকার জনগণের। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডেনমার্কের পাশে থাকার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোট জানিয়েছেন, তিনি জার্মানি ও পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন।
ইইউ কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন যেখানেই ঘটুক না কেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তা মেনে নেবে না এবং প্রয়োজনে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ককে সমর্থন দেবে।
ডেনিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎজফেল্ড পরিস্থিতির বিষয়ে আলোচনার জন্য রুবিও’র সঙ্গে জরুরি বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছেন। রাসমুসেন সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, চিৎকার-চেঁচামেচি বন্ধ করে আমাদের এখন একটি বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনায় বসতে হবে।
ডেনমার্কের পার্লামেন্টে গ্রিনল্যান্ডের সদস্য আজা চেমনিৎজ রয়টার্সকে বলেন, গ্রিনল্যান্ড কখনও বিক্রির জন্য ছিল না এবং ভবিষ্যতেও হবে না। মার্কিন কর্মকর্তাদের সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ না করার বিষয়টি সম্পূর্ণ আতঙ্কজনক বলে তিনি অভিহিত করেন।
ডেনমার্কের প্রতিবাদ: রুশ ও চীনা উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক
ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, রুশ ও চীনা জাহাজ গ্রিনল্যান্ডের জলসীমায় ঘোরাঘুরি করছে, যা ডেনমার্ক প্রত্যাখ্যান করেছে। রাসমুসেন বলেন, নুউক ফোঁ এর ভেতরে রুশ ও চীনা জাহাজের উপস্থিতি এবং বিপুল চীনা বিনিয়োগের যে চিত্র আঁকা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। মেরিন ট্রাফিক এবং এলএসইজি-এর ভেসেল ট্র্যাকিং তথ্যেও গ্রিনল্যান্ডের কাছে চীনা বা রুশ জাহাজের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের সামরিক ক্ষমতা কেড়ে নিতে লড়ছে মার্কিন সিনেট
ট্রাম্পের অবরোধে গভীর জ্বালানি সঙ্কটের আশঙ্কায় কিউবা