ইরানের রাজপথে অস্থিরতা কিছুটা কমে আসায় এবং তেহরানের জনজীবন স্বাভাবিক হতে শুরু করায়, শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে লক্ষ্যণীয়ভাবে নমনীয় সুর শোনা গেছে। গণ-মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার সিদ্ধান্তের জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।
একই সাথে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার যে আভাস তিনি আগে দিয়েছিলেন, তা থেকেও যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমাদের জানানো হয়েছে যে ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে এবং সেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা নেই... বিশ্বস্ত সূত্রে আমি এ তথ্য পেয়েছি... এবং তারা যে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে, তাকে আমি অত্যন্ত সম্মান জানাই।

নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেও ট্রাম্প একই দাবির পুনরাবৃত্তি করে পোস্ট করেন, ৮০০-র বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, যা এখন আর হচ্ছে না। সেখানে তিনি লিখেন, ধন্যবাদ!
এর আগের কয়েক দিন ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরান সরকার যদি সহিংস বিক্ষোভ দমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে তার জবাব দিতে পারে। শুক্রবারের সুর পরিবর্তন এই ধারণাকেই জোরালো করেছে, আমেরিকার আসন্ন সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি আপাতত প্রশমিত হচ্ছে।
এর আগে বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে ট্রাম্প লিখেছিলেন, সাহায্য আসছে। শুক্রবার সেই বার্তাটি এখনো কার্যকর কি না জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেন, দেখা যাক কী হয়।

আরব বা ইসরাইলি কর্মকর্তারা তাকে ইরানের ওপর হামলা থেকে বিরত থাকতে প্ররোচিত করেছেন কি না-এমন প্রশ্নে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, এই সিদ্ধান্তটি একান্তই তার নিজের। তিনি বলেন, কেউ আমাকে বোঝায়নি। আমি নিজেই নিজেকে বুঝিয়েছি।
অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে দেখা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে তেহরানে কোনো বিক্ষোভের চিহ্ন নেই; কেনাকাটা ও সাধারণ জীবনযাত্রা আগের রূপে ফিরতে শুরু করেছে। তবে সপ্তাহব্যাপী চলা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা বন্ধের পরিস্থিতি এখনো কাটেনি। দেশটির অন্য কোথাও বড় ধরনের কোনো অস্থিরতার খবর পাওয়া যায়নি।
তবে ইরানের নেতৃত্ব যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় রেডিওতে সম্প্রচারিত জুমার খুতবায় আয়াতুল্লাহ আহমদ খাতামি মুসল্লিদের সমবেত স্লোগান শোনাতে উদ্বুদ্ধ করেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল- ‘সশস্ত্র মুনাফিকদের মৃত্যুদণ্ড চাই!’
ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ এবং অভিভাবক পরিষদের সদস্য খাতামি বিক্ষোভকারীদের ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘বুলেট’ এবং ‘ট্রাম্পের সৈনিক’ হিসেবে চিত্রিত করেন। তিনি উভয় নেতাকেই ইরানের কাছ থেকে ‘ভয়াবহ প্রতিশোধের’ জন্য প্রস্তুত থাকতে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, আমেরিকান এবং জায়নিস্টদের শান্তিতে থাকার আশা করা উচিত নয়।

বিক্ষোভে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ
খাতামি বিক্ষোভে ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক হিসাব তুলে ধরেন। তিনি জানান, ৩৫০টি মসজিদ, ১২৬টি নামাজ ঘর এবং ২০টি ধর্মীয় স্থানে ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এছাড়া জুমার খুতবা পাঠকারী ইমামদের ৮০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ৪০০টি হাসপাতাল, ১০৬টি অ্যাম্বুলেন্স, ৭১টি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এবং আরও ৫০টি জরুরি সেবার যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে, ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি ওয়াশিংটনকে বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে দেওয়া আগের প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান জানিয়েছেন এবং ট্রাম্পকে একজন ‘কথার পাকা মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়া শাহের পুত্র পাহলভি বলেন, তিনি এখনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সহায়তার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেন।
তবে বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলার সম্ভাবনা- উভয়ই কমে আসার পেছনে কূটনৈতিক উদ্বেগের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ‘দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’-কে একজন কূটনীতিক জানিয়েছেন যে মিশর, ওমান, সৌদি আরব এবং কাতারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপ এ অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
সংকট কি কাটল নাকি সাময়িক বিরতি?
বর্তমান সংকটময় মুহূর্তটি কেটে গেছে নাকি এটি কেবল একটি সাময়িক বিরতি- তা এখনো স্পষ্ট নয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর নেতৃত্বাধীন একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে সরিয়ে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা ট্রাম্পের সামনে সামরিক বিকল্পের পথ খোলা রাখছে।
ট্রাম্পের চিরচেনা কৌশলের মতোই মিত্র, শত্রু এবং বৈশ্বিক বাজার- সব পক্ষকেই তিনি ধোঁয়াশায় রেখেছেন। তিনি সামরিক ব্যবস্থার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ না করে বলেন, পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন।
তবে কয়েক দশকের শত্রুতার পর ওয়াশিংটন যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে শেষ পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দেয়ার প্রলোভন অনুভবও করে, বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বিমান হামলা ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং তাদের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ব্যাপক ক্ষতি করতে পারলেও বর্তমান সরকারকে হটিয়ে দেয়া অসম্ভব।
ওয়াশিংটনে সতর্কতা
ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরেও অনেক পক্ষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একটি যুদ্ধ-অভিজ্ঞ রাষ্ট্র এবং বারবার প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সক্ষমতা তারা দেখিয়েছে। তাই ভেনেজুয়েলার মতো ভঙ্গুর রাষ্ট্রের চেয়ে (বিপুল তেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও) ইরান অনেক বেশি শক্তিশালী ও কঠিন প্রতিপক্ষ।
বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি না দেয়ায় ইরানকে ‘ধন্যবাদ’ জানালেন ট্রাম্প
ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ সামান্য সচল হয়েছে: নেটব্লকস
সাত স্ত্রী ও ১৩৪ জন সন্তান, বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক পুরুষের মৃত্যু