ইরানের পতনে কেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্য?

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

কল্পনা করুন এমন একটি দেশের কথা, যেখান থেকে হঠাৎ সব পুলিশ উধাও হয়ে গেছে। চারদিকে বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর আর চোর-ডাকাতদের অবাধ বিচরণ। এবার ভাবুন, সেই দেশটিতেই যদি থাকে এমন সব ভয়ংকর পারমাণবিক উপাদান, যা দিয়ে লাখ লাখ মানুষকে বিষিয়ে দেয়া সম্ভব। ঠিক এই আশঙ্কাটিই এখন ইরানকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে দানা বাঁধছে।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের দিকে একটি বিশাল রণতরির বহর বা 'আর্মাডা' অগ্রসর হচ্ছে। 'ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল' বলছে, বিক্ষোভকারীদের ওপর ইরান সরকারের সহিংস দমনের প্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক অভিযানের কথা ভাবছে। 

এই মার্কিন রণতরির উপস্থিতি কেবল হামলার জন্য নয়; বরং ইরানে যদি চরম অরাজকতা তৈরি হয়, তবে সেখানকার পারমাণবিক উপকরণগুলো সুরক্ষিত করতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ‘স্ন্যাচ অ্যান্ড গ্র্যাব’ (দ্রুত দখল ও উদ্ধার) অভিযানের একমাত্র উপায় হতে পারে এই নৌবহর। 

বিষয়টি উদ্বেগজনক কারণ ইরানের কাছে প্রচুর পরিমাণে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে এবং তারা পরমাণু চুল্লি পরিচালনা করছে। যদি সরকারের পতন ঘটে এবং বিশৃঙ্খলা শুরু হয়, তবে এই পারমাণবিক উপাদানগুলো ভুল হাতে চলে যেতে পারে, যা গোটা বিশ্বের জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে।

উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে একটি সুরক্ষিত সিন্দুকে রাখা লোড করা বন্দুকের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যতক্ষণ সিন্দুকটি তালাবদ্ধ, ততক্ষণ সবাই নিরাপদ। কিন্তু সিন্দুক ভেঙে গেলে যে কেউ এটি হাতিয়ে নিতে পারে। বিপজ্জনক গোষ্ঠী, মিলিশিয়া এবং সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এই উপাদানগুলো চুরি করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করতে পারে। ইতিহাস বলে এমনটি আগেও ঘটেছে এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা এখন আতঙ্কিত।

ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ প্রায় এক হাজার পাউন্ড ইউরেনিয়াম রয়েছে। পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য এটিকে আর খুব বেশি প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজন নেই। এটি অনেকটা এমন যে, একটি পুরো শহর ধ্বংস করে দেওয়ার মতো বোমার প্রধান উপকরণটি তৈরি হয়েই আছে। 

বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এই উপাদানগুলো সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্স এবং ক্ষতিগ্রস্ত সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ব্ল্যাক মার্কেট বা কালোবাজারে এর আকাশচুম্বী দামের কারণে কোনো সংকল্পবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ইচ্ছুক দেশের কাছে এটি চোরাচালান করা অত্যন্ত লোভনীয়।

ইউরেনিয়ামের বাইরেও ইরানে বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লিটি এখনও চালু রয়েছে। এর চারপাশে বড় বড় পানির পুলে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি দণ্ড রাখা আছে, যাতে সিজিয়াম-১৩৭-এর মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থ রয়েছে। বিষয়টি কেন ভয়ংকর, তার কারণ হলো- এই সিজিয়াম-১৩৭ সেই একই তেজস্ক্রিয় পদার্থ যা ১৯৮৬ সালের বিপর্যয়ের পর ইউক্রেনের চেরনোবিলকে কয়েক দশকের জন্য বসবাসের অযোগ্য করে দেয়। 

কয়েক দশক পার হয়ে গেলেও মানুষ আজও সেখানে ফিরতে পারেনি। যদি ইরানের এই পুলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তেজস্ক্রিয়তা বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে, যা ইরান এবং পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় দেশগুলোর হাজার হাজার মানুষকে বছরের পর বছর ধরে বিষিয়ে দেবে। বাতাস কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করেই সীমান্ত পেরিয়ে তেজস্ক্রিয়তা বহন করে নিয়ে যাবে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বহু দূরের নিরপরাধ মানুষও।

এছাড়া ইরান বিভিন্ন চিকিৎসা ও গবেষণা কেন্দ্র পরিচালনা করে যেখানে উচ্চ মাত্রার তেজস্ক্রিয় পদার্থ রয়েছে, যা দিয়ে ‘ডার্টি বোম্ব’ বা নোংরা বোমা তৈরি করা সম্ভব। ডার্টি বোম্ব হলো সাধারণ বিস্ফোরক ও তেজস্ক্রিয় পদার্থের মিশ্রণ। এটি বিস্ফোরিত হলে চারদিকে প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে দেয় এবং মাটি ও পানিকে দূষিত করে ফেলে। এর ক্ষয়ক্ষতি পারমাণবিক অস্ত্রের মতো বিশাল না হলেও এটি পুরো একটি শহরকে আতঙ্কিত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ইতিহাস এখানে আমাদের বড় শিক্ষক হতে পারে। ১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে, তখন বিশ্ব একটি পারমাণবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারত। কিন্তু সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল: আমেরিকা কেবল জোর করে ঢুকে সবকিছু দখল করেনি। বরং ভেঙে পড়া সোভিয়েত সরকার সহযোগিতা করেছিল। ‘কোঅপারেটিভ থ্রেট রিডাকশন প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে উভয় পক্ষ একসঙ্গে কাজ করেছিল। 

রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ এবং কাজাখস্তানকে তাদের পারমাণবিক উপকরণ ও ওয়ারহেডগুলো সুরক্ষিত করতে আমেরিকা কোটি কোটি ডলার ব্যয় করেছিল। সোভিয়েত নেতারা শৃঙ্খলা বজায় রেখেই নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করেছিলেন। সেই সহযোগিতার ফলে সবকিছু অনেক বেশি নিরাপদ ও সুসংগঠিত হয়েছিল।

কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে যদি সরকারের সম্পূর্ণ পতন ঘটে, তবে সহযোগিতা করার মতো হয়তো কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। কোনো দায়িত্বে কেউ থাকবে না, কোনো চুক্তিতে আসার মতো কাউকে পাওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে দেশগুলোর অত্যন্ত আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে- যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘স্ন্যাচ অ্যান্ড গ্র্যাব’ বা ‘সিল অ্যান্ড সিকিউর’ অপারেশন বলেন। 

সহজ কথায়, সশস্ত্র দলগুলো দ্রুত ভেতরে ঢুকে বিপজ্জনক সব উপকরণ নিজেদের কব্জায় নেবে; কোনো অনুমতির অপেক্ষা না করেই বিপজ্জনক সাইটগুলো সিল করে দেবে। 

এই কারণেই মার্কিন নৌবহরের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। এর সামরিক শক্তি ও সুরক্ষা এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় ঢাল হিসেবে কাজ করবে। এটি বিপজ্জনক ও বিশৃঙ্খল হতে পারে, তবে সবকিছু পুরোপুরি ভেঙে পড়লে এটিই হয়তো একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়াবে।

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর তুইথা পারমাণবিক কমপ্লেক্সটি কয়েকদিন অরক্ষিত পড়ে ছিল। স্থানীয় লোকজন সেখানে ঢুকে বিভিন্ন সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়। সেই ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, অরাজকতার সময় পরমাণু কেন্দ্রগুলোকে লুটেরাদের হাত থেকে বাঁচাতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কী ঘটতে পারে।

দক্ষিণ আফ্রিকা এক্ষেত্রে আশার আলো দেখায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন বর্ণবাদের অবসান ঘটে, তখন সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ভেঙে ফেলেছিল। তারা আন্তর্জাতিক তদারকিতে সব কিছু যথাযথভাবে পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেছিল।

বর্তমানে আমেরিকা এবং তার মিত্ররা এক কঠিন ও বিপজ্জনক সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে। তাদের এখনই জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। যদি ইরানের সরকার সহযোগিতা করার মতো স্থিতিশীল থাকে, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে নিরাপদ পথ। কিন্তু যদি অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে, তবে বিশ্বকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সাগরে অবস্থানরত এই নৌবহর শুধু কোনো হুমকি নয়- এটি একটি বিমা, যাতে প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। যে পথই বেছে নেয়া হোক না কেন, বসে থাকার সময় আর নেই। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং ঝুঁকির মাত্রা এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

আরবিএস
হরমুজ প্রণালী পুনরায় চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পেশ করা ‘সাত দিনের প্রস্তাব’ এখনও টেবিলে বহাল রয়েছে বলে সোজা জানিয়ে দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। রোববার...
পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ বলে ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর নৌবাহিনী।  সেই সঙ্গে ওই জলসীমায় শুক্রবার থেকে এ...
ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে দেশটির পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ভূগর্ভস্থ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন...
ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ যখন এক চরম অনিশ্চয়তায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, ঠিক তখনই মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক বিস্ফোরক পরিকল্পনা সামনে এসেছে। পারমাণিক বোমার বাইরে দেশটির হাতে...
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ গণমাধ্যম। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণমাধ্যমের সব থেকে বেশি ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিডিয়া যদি...
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা শেষে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতেই পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন সদ্য সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য...
নিজ নির্বাচনী এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে প্রকাশ্যে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও মহড়া দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দেশব্যাপী তোলপাড় ও সমালোচনার মুখে অবশেষে পদত্যাগ করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক...
সৌদি আরবে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ায় কূটনৈতিক তথ্য আদান-প্রদানে মারাত্মক ঘাটতি থাকার কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর