ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারমাণবিক বিরোধ এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা কমিয়ে আনতে আবারও শুরু হতে যাচ্ছে কূটনৈতিক আলোচনা। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান আলোচনার শর্তগুলো খতিয়ে দেখছে। নিচে এই উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়া হলো:
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা আর মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যাপক রণপ্রস্তুতির মাঝেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে আলোচনার পথ প্রশস্ত হচ্ছে। গত মাসে ইরান সরকারের কঠোর দমনপীড়নের পর সৃষ্ট উত্তেজনার মাঝে দুই পক্ষই এখন কূটনীতির টেবিলে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার জন্য তিনটি প্রধান শর্ত দিয়েছেন; এক- ইরানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা। দুই- ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ। তিন- আঞ্চলিক প্রক্সি বা ছায়া গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা।
ইরান আগে এই শর্তগুলোকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরান কিছুটা নমনীয় হওয়ার আভাস দিচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানি কর্মকর্তারা জানান, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের চেয়ে ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি নিয়ে ছাড় দেয়া তাদের জন্য বেশি কঠিন।
তবে আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে ইরান ৪০০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে এবং একটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম ব্যবস্থার অধীনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে প্রস্তুত।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি খুব শিগগিরই তুরস্কে বৈঠকে বসতে পারেন। তুরস্কের ক্ষমতাসীন দলের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, চলতি সপ্তাহের আলোচনা মূলত কূটনীতির ওপর মনোনিবেশ করবে, যা সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হামলা এড়ানোর একটি সুযোগ হতে পারে।
তবে ইরান একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে, আলোচনা শুরু করতে হলে ইরানের উপকূল থেকে মার্কিন রণতরি ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে হবে। এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেন, কূটনীতি চলছে। এখন বল ট্রাম্পের কোর্টে। ট্রাম্প একদিন আগেই বলেছিলেন, তেহরান যুদ্ধের চেয়ে চুক্তিতে বেশি আগ্রহী।
গত এক বছরে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব অনেকটাই খর্ব হয়েছে। গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের ওপর ইসরাইলি হামলা এবং সিরিয়ার দীর্ঘদিনের মিত্র বাশার আল-আসাদের পতন তেহরানকে চাপে ফেলেছে। এছাড়া গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যত বন্ধ রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, তেহরান দ্রুততম সময়ে ‘অন্যায় নিষেধাজ্ঞা’ প্রত্যাহার চায়। ইরানের প্রধান লক্ষ্য হলো একটি চুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া, যার বিনিময়ে তারা তাদের মজুতকৃত ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠিয়ে দিতে এবং সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখতে রাজি।
২০২৩ সালের মে থেকে ঝুলে থাকা এই আলোচনা এখন এক চূড়ান্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে। পশ্চিমা দেশগুলোর ভয়, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে যেতে পারে। অন্যদিকে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তাদের এই কর্মসূচি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য।
এখন দেখার বিষয়, তুরস্কের সম্ভাব্য বৈঠকটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির নতুন বার্তা নিয়ে আসে, না কি শর্তের বেড়াজালে আবারও ভেস্তে যায় এই ঐতিহাসিক সুযোগ।
ইরানে হামলা মানেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ, ট্রাম্পকে সতর্ক করলেন খামেনি
ইরানের পতনে কেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্য?
এপস্টাইন নথি: ফার্গুসন ও রাজকন্যাদের নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস
ভারতে নীরব এক মহামারির নাম ‘সর্পদংশন’