গত এপ্রিল মাসে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে আমেরিকা এবং ইরান এক অলিখিত ও নজিরবিহীন মহাসংঘাতের জড়িয়ে পড়ে, যা দু’পক্ষের মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ হামলা-পাল্টা হামলার রাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
কয়েক দিনের টানা উত্তেজনা এবং সব পক্ষের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের জেরে দুই দেশের মধ্যকার শান্তি আলোচনা এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হয় তখন, যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরানের খার্গ দ্বীপের বন্দরের দিকে এগিয়ে যাওয়া বতসোয়ানার পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাংকারে সরাসরি আঘাত হানে।
মার্কিন বাহিনীর দাবি, জাহাজটি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া অবরোধ বা ব্লকেড অমান্য করেছিল। এই হামলার চড়া জবাব দিতে ইরানও কালবিলম্ব করেনি; তারা পাল্টা আঘাত হিসেবে একটি লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
তবে পরিস্থিতি সবচেয়ে মারাত্মক রূপ নেয় যখন মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইরানের কাসাম দ্বীপের একটি সামরিক গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে বোমা হামলা চালিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেয়। এই ঘটনার পরই ক্ষোভে ফেটে পড়ে তেহরান। তারা মার্কিন বাহিনীকে চরম শিক্ষা দিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই দেশ, কুয়েত এবং বাহরাইনকে লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র এবং আত্মঘাতী ড্রোন নিক্ষেপ করে।

ইরান দাবি করেছে, তারা ওই অঞ্চলে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমান ও হেলিকপ্টার ঘাঁটি এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরকে সফলভাবে নিশানা করেছে। তবে ওয়াশিংটন এই দাবি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর ওপর চালানো ইরানের সমস্ত হামলা ব্যর্থ হয়েছে। পেন্টাগন আরও যোগ করেছে, ইরানের ছোঁড়া বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মাঝআকাশেই প্রতিহত করা হয়েছে এবং বাকিগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সাগরে পতিত হয়েছে।
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো আভাস দিয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পর্দার অন্তরালে আলোচনা এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবিসি নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তি করা সম্ভব।
কিন্তু মাঠের বাস্তব চিত্র বলছে, এই যুদ্ধবিরতি এখন সুতোর ওপর ঝুলছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতেই ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের পরোক্ষ আলোচনা স্থগিত করার হুমকি দিয়েছিল এবং সাফ জানিয়েছিল, লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলের আগ্রাসন যদি অবিলম্বে বন্ধ না হয়, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তারা যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট খুলে দেবে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ট্রাম্পও ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন যাতে তারা লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান কিছুটা কমিয়ে আনে। এই সংকট নিরসনে আজ, বুধবারও (৩ জুন) দুই পক্ষের মধ্যে আরও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হওয়ার পর থেকেই আমেরিকা ও ইরান মাঝেমধ্যেই একে অপরের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে আসছিল। ইরান এর আগেও কুয়েত, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নিশানা করেছে।
অন্যদিকে মার্কিন বাহিনীও হরমুজ প্রণালীর আশেপাশে ইরানের সামরিক অবস্থান এবং অবরোধ অমান্যকারী ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে অনবরত আঘাত হেনে আসছিল। তবে মঙ্গলবারের এই প্রকাশ্য ও বড় ধরণের সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়ংকর ও পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিল।
তথ্যসূত্র: সিএনএ ও রয়টার্স
