ঢাকা ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

হাত ছাড়া জন্মেও থামতে শেখেননি হেলাল

হৃদয় আলম, একাত্তর
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারী ২০২২ ১৮:০৭:৫৭ আপডেট: ২২ জানুয়ারী ২০২২ ১৮:৪৫:৪৫
হাত ছাড়া জন্মেও থামতে শেখেননি হেলাল

গাজীপুরের কাশিমপুর থেকে কিছুটা এগিয়ে সুলতান মার্কেটের সরু গলিতে ঢুকলে অন্য রকম এক দোকানির সাথে দেখা হয়ে যাবে আপনার।

প্রথম দেখায় কিছুটা চমকে উঠতে পারেন। কারণ হেলাল উদ্দিন অন্যদের মতো হাত বাড়িয়ে পণ্য তুলে দিতে পারেন না। জন্ম থেকেই তার দুটো হাত নেই।

হেলাল এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারি বাঙলা কলেজে সমাজকর্ম বিভাগে ভর্তি হয়েছেন। ক’দিন হলো ঢাকায় এসেছেন। ফাঁকে এখন ভাইয়ের ব্যবসা সামলাচ্ছেন।

যশোরের কন্দর্পপুর গ্রামে কৃষক পরিবারে জন্মেছেন দুই হাত ছাড়া হেলাল। বেড়ে উঠেছেন সেখানেই। সন্তানের বিষয়ে কখনও তার বাবা-মা হতাশ হননি। বরং প্রতিবেশীসহ অন্যদের তারা বোঝাতেন, সবাই মিলে চেষ্টা করলে হেলালও অন্যদের মতো সুন্দর জীবনে বেড়ে উঠতে পারে।


‘পাড়া-প্রতিবেশীরা বাবা-মাকে মাঝে মাঝে কিছু বলার চেষ্টা করতো, কিন্তু তারা কানে নিতেন না’, বলেন হেলাল। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সে তৃতীয়।

হেলালকে হাঁটা শিখিয়েছেন তার বড় ভাই আব্দুর রহমান সবুজ। কিন্তু সময় লেগেছে প্রায় পাঁচ বছর। অন্য শিশুরা যখন ছোটাছুটি করতো তখনও হেলাল উঠানে হামাগুড়ি খেতো। সাত বছর বয়সে বাবার কোলে প্রথম স্কুলে যান হেলাল। নতুন বন্ধু হয়। খেলতে শিখেন।

বাড়ি থেকে মাইল তিনেক দূরে হেলালের স্কুলে বন্ধুরা যখন সাইকেল চালিয়ে যেতো, হেলাল একা একাই হেঁটে পাড়ি দিতেন পুরো পথ।

তিনি সাইকেল চালাতে পারতেন না। ‘অন্যরা যখন সাইকেলে যেতো, আমি চেয়ে থাকতাম। মনে হতো- ইশ্ আমি যদি যেতে পারতাম। আমার যদি একটা সাইকেল থাকতো, যদি চালাতে পারতাম’, আফসোস করে বলেন হেলাল।

আরও পড়ুন: চাকরি হারিয়ে সুরের ফেরিওয়ালা মামুন

দেখতে দেখতে কয়েক বছর পেরিয়ে গেলো। মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হলেন। উচ্চ-মাধ্যমিকে ভর্তি হলেন সরকারী বীর শ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মাদ কলেজে।

‘পরীক্ষার হলে যখন অন্যরা দুই-তিনটা করে প্রশ্ন লিখে ফেলতো আমি একটা বা অর্ধেক শেষ করতাম। সৃজনশীল আসার পর থেকে লেখা বেড়ে গেলো। সবাই লিখে অতিরিক্ত পৃষ্ঠা নিতো, আমি কখনো তা পারিনি। আমার জীবনে কখনো পরীক্ষায় আমি পুরো খাতা শেষ করতে পারিনি।’ আক্ষেপ নিয়ে বলেন হেলাল।


উচ্চ মাধ্যমিকে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া খারাপ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার তখনো লেখা বাকি। অর্ধেকের একটু বেশি হয়েছে বোধ হয়। স্যার এসে খাতা টেনে নিয়ে গেলো। আমাকে বললেন, যা লিখেছো পাস করবা। কখনো কখনো আমি ‘বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন’ হওয়ায় অনেক স্যার-ম্যামরা ২০ মিনিট সময় বাড়িয়ে দিতেন। কিন্তু ওই পরীক্ষাটা আমার খুবই খারাপ হয়। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা যথাযথ বাস্তবায়ন করলে ভালো হতো।’

‘আমি চাই আমার মতো আরো যারা আছেন, তারা সমস্যায় না পড়ুক। আমাদের জন্য বিশেষভাবে বিবেচনা করা হোক।’

উচ্চ মাধ্যমিকের পর এবার স্নাতকের গণ্ডি পার করে আরো এগিয়ে যেতে চান হেলাল। বলেন, ‘মায়ের জমানো টাকা দিয়ে কোচিং করেছি। অনেক কষ্টে মা টাকাগুলো সঞ্চয় করেন। ঢাকাও আসতে দেয়নি সে সময়। আমি অন্যদের সাথে মিশতে পারবোনা সেই ভয়ে। এখন আমি বাঙলা কলেজে চান্স পেয়েছি, ভালো কিছু করতে চাই।’


হাত না থাকলেও অন্যদের মতো স্বপ্ন দেখেন হেলাল। কাজ করতে চান নিজের মতো বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের জন্য। শিক্ষক হয়ে ছড়িয়ে দিতেন চান জ্ঞানের আলো। নিজ উপার্জনে বাবার সাথে রোজ দু’মুঠো ভাত খেতে চান তিনি।


একাত্তর/আরএ

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন