বর্ষপঞ্জি সংশোধনে যুগলবন্দী হয়েছে বসন্ত ও ভালোবাসা। সেই ধারাতেই ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রতি বছরের মতো এবারও দেশজুড়ে উৎসবের রঙ ছড়িয়ে উদযাপিত হচ্ছে দুটো দিবস।
ভালোবাসা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না। এর সার্বজনীন কোনো সংজ্ঞাও নেই। পরিবেশ ও স্থানভেদে এর সংজ্ঞাও যেনো বদলে যায়। যেমনটা বলা চলে, মাত্র কয়েক বছর আগেও ভালোবাসা দিবসে সৌদিতে গোলাপ বিক্রিতে ছিলো কড়াকড়ি।
তবে ভালোবাসা দিবসের অধিকাংশ জুড়েই রয়েছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। জীবনের এই সময়ে থাকে চূড়ান্ত আবেগ, অনুভূতির চর্চা। আর তাই আমরা কথা বলেছি তরুণ-তরুণীদের সাথে।
আরও পড়ুন: ভ্যালেন্টাইন ভুলিয়ে দিচ্ছে স্বৈরাচার প্রতিরোধের রক্ত পলাশ
জানতে চাওয়া হয়েছিলো ব্যতিক্রমী ভালোবাসার কথা, ফাল্গুন নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। নতুন ভাবনা আর প্রত্যাশার কথা। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে একাত্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন সাইফুল, রিপা, শান্তা, নাজমুল, উজ্জ্বল, তেসিনসহ কয়েকজন তরুণ-তরুণী।
সাইফুল ইসলাম খান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম খানের কাছে ভালোবাসা মানে সহজ ও স্বাভাবিক কিছু। কোনো কিছু যত্ন করে রাখাই ভালোবাসা। জটিল কিছু নয়।
তার ভাষায়, ‘ভালোবাসা দিবসকে যদি আমরা ব্যাখ্যা করতে চাই, এটা পশ্চিমাদের একটা সংস্কৃতি। সাধারণত আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতি বা উপমহাদেশের সংস্কৃতিতে এমন কোনো দিবস ছিলোনা। বাংলাদেশের যে সমাজব্যবস্থা বা ধর্মীয় ব্যবস্থার বিবেচনায় যদি বলি তাহলে বিয়ের পূর্বে ছেলে মেয়েদের মেলামেশার কোনো স্বীকৃতি নেই। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই দিবসকে অনেকেই ভালো চোখে দেখে না।’
সাইফুল বলেন, ‘আমার মতে এই দিবসটি সার্বজনীন করা উচিত। যাতে সমাজের সবাই এতে অংশ নিতে পারে। ভালোবাসা শুধু দু’জন নর-নারীর মধ্যেই আটকে না থাকে। ভালোবাসা মানুষের প্রতি, মানবিকতার প্রতি ছড়িয়ে দেওয়া যায় কিনা তা ভাবতে হবে।’
দিনটি তখনই সার্থক হবে, যখন ভালোবাসার এই দিনটি যুগল ভালোবাসার বাইরে এসে বৃহত্তর স্বার্থে রূপ পাবে।
ভালোবাসায় স্বার্থ থাকে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসাকে আমরা নানান কারণে ভাগ করে ফেলি। কিন্তু যদি ভালোবাসাই বলি, তা কখনো স্বার্থের জন্য হতে পারে না। স্বার্থ থাকলে আর সেটা ভালোবাসা হয়না।’
আরও পড়ুন: ভালোবাসায় প্রচণ্ডরকম প্রতীক্ষা এখন দেখা যায় না
বসন্তের শুরুতে ভালোবাসা দিবস কি বিশেষ কোনো গুরুত্ব বহন করে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বসন্তের সময়ে আমাদের দেশে যে আবহাওয়া বিরাজ করে, তাতে আমাদের মন বেশ ফুরফুরে থাকে। আবহাওয়াটাও নাতিশীতোষ্ণ। এমন সময়ে ভালোবাসা দিবসটা সবার মনেই যেনো দোলা দিয়ে যাবে। এ সময় দিবসটি একটু বেশিই মধুর মনে হবে। ভালো মন, সুন্দর পরিবেশে সুন্দর দিন আমাদের জন্য ভালো কিছু নিয়ে আসতে পারে।’
ভালোবাসায় সৌন্দর্য গুরুত্বপূর্ণ না। এটা নির্ভর করে ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। তথাকথিত সুন্দর না হয়েও কেউ একজন ভালো ব্যক্তি হতে পারেন, যোগ করেন সাইফুল।

রুবায়না রশিদ রিপা
উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী রুবায়না রশিদ রিপার কাছে ভালোবাসা মানে সম্মান, একটু খানি অ্যাডজাস্টমেন্ট, আর এক সাথে এগিয়ে যাওয়া।
তার ভাষায়, ‘ভালোবাসা অপবিত্র না। যদিও সেটাকে আজকালকার জেনারেশন তাদের উদযাপনের বিভিন্ন দিক থেকে নোংরামির দিকে নিয়ে গেছে। আমার মতে, ভালোবাসাকে মন থেকে আপন করলে আলাদাভাবে আলাদা দিনে পালন করা লাগে না।
প্রতিদিনই সেটা পালন করা যায়। শুধু দামি জায়গায় ঘুরতে যাওয়া আর খেতে যাওয়াতে যে ভালোবাসা প্রকাশ হয় তা না, হতে পারে সেটা একসাথে টংয়ে চা খাওয়া, কিংবা এক সাথে বসে গল্প করা, বা কারো হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করা। এ জন্যে আলাদা দিন লাগে না।’
তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা মানে আজকাল প্রেমিক যুগলের ভালোবাসাই বুঝায়। কিন্তু আসলে কি তাই? আমার মতে বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবাইকেই আমরা ভালোবাসি, ভালোবাসা সবার জন্য। পৃথিবীর সব ভালবাসা হোক নিঃস্বার্থ, কলুষিত না হোক।’
আরও পড়ুন: লাল গোলাপ কেন প্রেম-ভালোবাসার প্রতীক
বসন্তের দিনে ভালোবাসা দিবসের গুরুত্ব উল্লেখ করে রিপা বলেন, ‘ভালোবাসা তো বসন্তের মতোই রঙিন, স্নিগ্ধ, সুন্দর। হয়তো এ কারণেই একসাথে উদযাপিত হয়।’
ভালোবাসায় সৌন্দর্য গুরুত্বপূর্ণ না কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে রিপা বলেন, ‘সুন্দরের প্রতি সকলেরই আকর্ষণ কাজ করে। তবে বাহ্যিক না, মনের ভেতরের দিক থেকে হতে হবে সুন্দর। রূপ চিরস্থায়ী নয়, তবে সুন্দর মন কে আজীবন ভালোবাসা ও সম্মান করা যায়।’

উজ্জ্বল হোসেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে পড়াশোনা শেষ করেছেন উজ্জ্বল হোসেন। চাকরি করছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তার মতে, ভালোবাসা হচ্ছে হৃদয়ের একটি অনুভূতি। ভালোবাসা মানে দূরে থেকেও কাছে থাকার অনুভব করা।
তিনি বলেন, আমি বুঝি ভালোবাসা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভালোবাসা বাবা-মা-ভাই-বোনের জন্য। ভালোবাসা প্রতিবেশীরও জন্য। তবে সব রকম ভালোবাসায় থাকতে হয় বিশ্বাস ও সম্মান। ভালোবাসা হোক প্রতি মুহূর্ত প্রতিটি দিন।
উজ্জ্বল বলেন, ভালোবাসা কখনো নোংরামি বা অপবিত্র হয় না। আমরা যেভাবে ভালোবাসি হয়তো সেই ভালোবাসা বর্তমানে নোংরামির কাতারে নিয়ে গেছে। ভালোবাসার নির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ থাকতে নেই। ভালোবাসা শাশ্বত।
তবে নির্দিষ্ট দিবসের গুরুত্ব যে আছে সেটা আমরা অস্বীকার করতে পারবো না। বর্তমানে এই দিবস শুধু ভালোবাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সাথে অর্থনীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাতও ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে।
বসন্তে ভালোবাসা দিবসের গুরুত্ব উল্লেখ করে উজ্জ্বল বলেন, বসন্তকে জড়িয়ে ধরেছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এদিন তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ তার প্রিয়জনকে ফুল দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করেন থাকেন। নানা আয়োজনে ফুলেল পরিবেশে হবে বসন্ত বরণের অনুষ্ঠান। ভালোবাসা আর বসন্ত মিলে উৎসবে মাতোয়ারা থাকবে পুরো দেশ।
তেসিন জামান
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী তেসিন জামান কাছে ১৪ ফেব্রুয়ারি স্মরণ করে রাখার মতো একটি দিন। তার মতে দিনটি স্মরণীয় করে রাখার জন্য বিশেষ কিছু করাই যেতে পারে।
তিনি বলেন, বর্তমানে ভালোবাসা দিবসের কথা এলেই সবাই একবাক্যে ধরেই নেই যে, এই দিনটি শুধু প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রী কিংবা ভালোবাসার মানুষটির জন্য। আমার কাছে মনে হয় ভালোবাসা দিবসটি যদি আমরা পরিবারের সাথে না কাটাই, তবে ভালোবাসা দিবসটিই বৃথা যাবে। আর যাই হোক মা-বাবাকে ছাড়া তো ভালোবাসা দিবসের কথা চিন্তাই করা যায় না।
তিনি আরো বলেন, আমার মতে ভালোবাসা দিবসের এই মূল্যবান সময়টুকু বাবা-মায়ের সাথেই কাটানো উচিত, জানানো উচিত তাদের প্রতি আমাদের ভালোবাসা।
প্রান্তিক হোসাইন
সরকারি তিতুমীর কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী প্রান্তিক হোসাইনের কাছে ভালোবাসা শব্দটা আপেক্ষিক। তার কাছে ভালোবাসার মানে সম্মান, শ্রদ্ধা ও মানিয়ে নেওয়া।
ভালোবাসায় নির্দিষ্ট কোনো দিবস লাগে না উল্লেখ করে প্রান্তিক বলেন, ‘ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিবস লাগে না। কেননা এটা বাৎসরিক কোনো বিষয় নয়। যতদিন বেঁচে থাকবেন, ভালোবাসাটা ততদিনই আপনার লাগবে। আর যারা নোংরামি করে বেড়ায় তারা আসলে ভালোবাসার সংজ্ঞাই জানে না।’
ভালোবাসায় স্বার্থ থাকে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো ভালোবাসাই নিঃস্বার্থ না। তবে স্বার্থটা কিসের সেটাই মূল।
বসন্তের প্রথম দিনে ভালোবাসার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে প্রান্তিক বলেন, আপনি যখন প্রেমে পড়বেন, তখন আপনার প্রতিটি দিনই আপনার কাছে বসন্ত কাল মনে হবে। ভালোবাসা দিবসের সাথে বসন্তের সম্পর্কটা এমন।
ভালোবাসায় সৌন্দর্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে হোসেইন বলেন, সৌন্দর্য মানে শুধুই দৈহিক সৌন্দর্য নয়। মনের চিন্তাভাবনার সৌন্দর্যটাই মূল।
শান্তা ইসলাম
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) শিক্ষার্থী শান্তা ইসলামের কাছে ভালোবাসা মানে এক ভিন্নরকম অনুভূতি। তার ভাষায়, ‘প্রিয় মানুষটাকে যত্ন করে আগলে রাখা, ভালো রাখতে চাওয়ার প্রবণতাটাই ভালবাসা। এটা জীবনের সুন্দর একটা ধাপ।’
তিনি বলেন, ‘ভালবাসা দিবসটিকে যুগলের মধ্যে আটকে ফেলায় অনেকেই দিনটাকে অপবিত্র চোখে দেখে। কিন্তু ভালবাসা সুন্দর ও পবিত্র। তাই এমন সুন্দর একটি দিনে প্রিয় মানুষের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করতে দ্বিধা নেই। প্রিয় মানুষটি হতে পারে, বাবা-মা, ভাই-বোন, কিংবা জীবন সঙ্গী।’
ভালোবাসায় স্বার্থ থাকে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা আর স্বার্থ কখনো একইসাথে পথ চলতে পারেনা। ভালবাসা মানেই নিঃস্বার্থ।’
বসন্তের শুরুতে ভালোবাসা দিবস কি বিশেষ কোনো গুরুত্ব বহন করে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় ভালবাসা মানেই রঙ। বসন্ত আর ভালবাসার একসাথে এই আগমন যেন তাই ফুটিয়ে তুলতে চায়। বসন্তের রং-বেরঙের ফুল যেন ভালবাসায় আবারও নতুন করে রং যোগ করে যায়।’
ভালবাসা মানেই যেখানে সুন্দর, সেখানে সৌন্দর্য আলাদা করে কোন গুরুত্ব বহন করে না। ভালবাসার চোখে সবকিছুই সুন্দর, যোগ করেন শান্তা।

নাজমুল হুদা
তিতুমীর কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল হুদা বলেন, ভালোবাসা, শব্দটি শুনলে শত মন খারাপের মাঝেও ঠোঁটের কোণায় চলে আসে একটা মুচকি হাসি। যখন দিনটিই ভালোবাসার-ভালো লাগার, তখন সেই দিনটিও কাটে প্রিয়জনের সাথে বহুমুখী আমেজে।
প্রিয়জনের সাথে কুশল বিনিময় করে, একে অপরকে উপহার দিয়ে, ফুল দিয়ে এই দিনটিকে প্রায় সকলেই উপভোগ করেন, আর দিনটি ঠাঁই করে নেয় সকলের প্রাণে। এই দিনে ভালোবাসা কেবল একজনকে কেন্দ্র করে নয় বরং ভালোবাসা হয়ে ওঠে সার্বজনীন।
একজন তরুণ হিসেবে এই দিনটিকে আমি অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি। বিশেষ এই দিনে আমি নিজের পরিবারের সবার সাথে সুন্দর কিছু মুহূর্ত কাটিয়ে থাকি। পাশাপাশি বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সকলের সাথেও কুশল বিনিময় করি। দিনটিতে ভালোবাসা সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রত্যেক ভালোবাসা দিবসে বন্ধু-বান্ধবীরা মিলে পথ শিশুদের মধ্যে ফুল ও বিভিন্ন উপহার দেয়ার চেষ্টা করে থাকি।
ভালোবাসা দিবসে শুধু নিজেদের মধ্যেই নয় বরং সকলের মধ্যে ভালোবাসা ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে এই দিনটি পূর্ণতা পায়। তাই প্রত্যেকের উচিত প্রত্যেককে ভালোবাসার রঙে রাঙানো।
