প্রধানমন্ত্রীর ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কারণে কোনো বিদেশি চক্রান্ত বাংলাদেশের রাজনীতি বা অর্থনীতিতে প্রভাব রাখতে পারছে না। এডিটরস গিল্ড আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বিশিষ্টজনরা বলেন, বিএনপি ভারত বিরোধী যে ডাক দিয়েছে, তা জনগণের জন্য নয়, দলের স্বার্থে। রাজনৈতিক দলগুলোর দেশের স্বার্থ বিবেচনা করেই বিদেশি কার্ড ব্যবহার করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তারা।
শনিবার বনানীর ঢাকা গ্যালারিতে এডিটরস গিল্ড আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা।
নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে বিদেশিদের তৎপরতার মূল লক্ষ্য অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাই ভারত বিরোধিতা যেমন রয়েছে, তেমনি আছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়া বিরোধী মনোভাবও।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ভারত বিরোধী মনোভাব ১০ শতাংশ মানুষের মধ্যে হলেও ঢুকেছে। এটার দায় দ্বায়িত্ব ভারতের।
এনটিভির বার্তা প্রধান জহিরুল আলম বলেন, আমাদের প্রতিবেশি ভারতের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের স্মার্টনেস অনেক বেশি। ভারত একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র এখানে চায় না, বাংলাদেশ একটি মুসলিম ডমিনেটেড রাষ্ট্র হলে তারা কার্ড হিসেবে তাদের রাজনীতিতে ব্যবহার করবে। এখানে যারা সাম্প্রদায়িক আছে তারা জিইয়ে থাকুক ভারত এটাই চায়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য বাংলাদেশ কংগ্রেসের ব্যাপারে যতো স্বস্তিবোধ করে, বিশেষ করে যদি আওয়ামী লীগের কথা বলি। সে জায়গায় বিজেপির রাজনীতি নিতে তার একটা অস্বস্তিবোধ আছে।
এসময় গাজা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান নিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী গাজার গণহত্যাকে যেভাবে টেনে এনেছেন, তার যারা পলিসি মেকার তারা তা করেনি। এমনকি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা একাডেমিশিয়ান তারাও সাহস করে গাজা নিয়ে লেখন না।
এডিটরস গিল্ডের গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেন, ভূরাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ এখন বিশ্ব দরবারে গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেশগুলোর ইতিবাচক ও নেতিবাচক সব ধরনের স্বার্থের খেলাই বেড়েছে বাংলাদেশের সাথে।
আইনজীবী ও গবেষক ড. ফারজানা মাহমুদ বলেন, ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের এখন যে শক্তিশালী অবস্থানটা হয়েছে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখন একটা ভারসম্যের রাজনীতিতে চলে এসেছেন সে কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে। এবং এই রাজনীতিতে বিদেশি কার্ড এই ভারসম্যের কারণে। এখানে ভারত যেমন ফ্যাক্টর, একইভাবে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রও ফ্যাক্টর।
যুক্তরাষ্ট্রের কোলগেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাভিন মুরশিদ বলেন, ভারতের সাথে আমাদের চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত রয়েছে। আমরা একই রাষ্ট্র ছিলাম। আমাদের অনেক ধরনের সম্পর্ক এখানে সম্পৃক্ত। কাঁটাতারসহ নানাভাবে ভারত রাষ্ট্র খুব চেষ্টা করছে বাংলাদেশিদের ভারতীয়দের থেকে দূরে রাখতে। যাতে তারা বাংলাদেশি হুমকি ব্যবহার করতে পারে। ওখানে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়কে বাংলাদেশি বলতে চায়।
গ্লোবাল টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, আঞ্চলিক রাজনীতি বলেন, বৈশ্বিক রাজনীতি বলেন, চীন-ভারতের ক্ষেত্রে আমি এটার নাম দিয়েছি 'চীন্ডিয়া পলিসি'। উনি চীন্ডিয়া পলিসি ভালোভাবে নিয়েছেন এবং একটা ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রী কোনো পক্ষকে বেশিও দিতে চান না, আবার বড় ধরনের শত্রুও বানাতে চান না। বাংলাদেশ একটা বিগ প্লেয়ার হয়েছে দু'টো কারণে, একটা হলো- শেখ হাসিনার এই ব্যাল্যান্স পলিটিক্স, দ্বিতীয় হলো- বাংলাদেশের অর্থনীতির স্পন্দন।

গোলটেবিল আলোচনার সঞ্চালক ও এডিটরস গিল্ডের সভাপতি মোজাম্মেল বাবু বলেন, বিএনপির একটা সংকল্পই হলো ভারত বিরোধিতা করে কিছু একটা করা। আওয়ামী লীগের ভেতরেও অতিরিক্ত ভারতের দিকে হেলে পড়া লোকজন আছেন। এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত কঠিন। আমি মনে করি একটা দিন আসবে যখন শেখ হাসিনার মতবাদ সারা পৃথিবীতে খুব গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ হয়ে দাঁড়াবে। যদিও আমরা এটার মর্যাদা দিতে পারছি না।
বহু আগে থেকেই বিএনপি ভারতবিরোধী মনোভাব পোষণ করে, যার ধারাবাহিকতা নির্বাচন ও নির্বাচনের পরেও দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বিশিষ্টজনরা।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকার ও সাধারণ মানুষের জন্য বিরোধীদলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই ইস্যুতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করাও গঠনমূলক রাজনীতি। কিন্তু সেটা গঠনমূলকভাবে করতে হবে।
এডিটরস গিল্ডের সভাপতি মোজাম্মেল বাবু বলেন, ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডে আমাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতির ভাষায় প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা সেখানে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু আমাদের শেষ ভরসার জায়গা বঙ্গবন্ধু তনয়া। তিনি পররাষ্ট্রনীতি যেভাবে এগিয়ে নিচ্ছেন, তার সভাসদ সেভাবেই করবেন আমাদের বিশ্বাস।
