চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর ও নওগাঁর সাপাহার সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইনের শিকার শিশু ও নারীসহ অন্তত ৪৫ জন দুই দিন খোলা আকাশের নিচে অবস্থানের পর ‘নিখোঁজ’ হয়েছেন।
শনিবার (৬ জুন) ভোর ও রাতের কোনো এক সময় তারা সীমান্ত এলাকা থেকে উধাও হয়ে যান। তবে সীমান্তে তাদের ব্যবহৃত পোশাক, ব্যাগ ও রান্নার সামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রের ধারণা, তাদের কঠোর নজরদারির মুখে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পেরে বিএসএফই রাতের আঁধারে তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।
একাত্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো বিস্তারিত খবর:
চাঁপাইনবাবগঞ্জে শূন্য রেখায় পড়ে আছে কাপড় ও ব্যাগ, উৎকণ্ঠা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে পুশইনের চেষ্টার পর বিজিবির প্রতিরোধের মুখে ২৮ জন বাংলাদেশি দুই দিন খোলা আকাশের নিচে জঙ্গলের মধ্যে অনাহারে-অর্ধাহারে অবস্থান করছিলেন। শনিবার সকাল থেকে ওই স্থানে তাদের আর দেখা যাচ্ছে না। তবে নো ম্যান্স ল্যান্ডের ওই স্থানে তাদের ব্যবহৃত পোশাক ও ব্যাগগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পুশইনের শিকার ওই ২৮ জনকে বিএসএফ ফিরিয়ে নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিএসএফ আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশক (বিজিবি) কিছু না জানালেও শনিবার ভোরে ওই এলাকা ফাকা পাওয়া যায়।
আনারপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, শুক্রবার রাতে তিনটি ভারতীয় গাড়ি বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে অবস্থান নেয়। এর কিছুক্ষণ পর দুই দফায় ভারতীয় বাহিনী সীমান্তের সার্চলাইটগুলো ১০ মিনিটের জন্য নিভিয়ে ফেলে। এর পর থেকেই ওই ২৮ জনকে আর শূন্য রেখা থেকে ভারতের অভ্যন্তরে দেখা যায়নি। সকালে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তারা সেখানে না থাকলেও তাদের সবার ব্যাগ ও পোশাক এদিক-ওদিক পড়ে রয়েছে। কিছু জিনিসপত্র ও রান্নার উপকরণ তালগাছের পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।
একই এলাকার বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, বিজিবি ও স্থানীয়দের তীব্র নজরদারির কারণেই বিএসএফ ওই ২৮ জনকে সরিয়ে নিয়েছে। তবে জিনিসপত্র রেখে যাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, আবারও সুযোগ বুঝে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে তাদের পুশইন করার চেষ্টা করা হতে পারে।
স্থানীয় শ্রমিক রহমত জানান, শুক্রবার তিনি আমগাছে আম পাড়তে ওঠার সময় লাইনের ওপার থেকে দুই জন নারী তাদের জন্য খাবার চেয়ে চিৎকার করছিলেন। তারা জানান, বিএসএফ মাত্র ১০ জনের জন্য এক বেলার শুকনা খাবার দিয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে থাকা ছয়টি শিশুকে ওই খাবার খাইয়ে নিজেরা অভুক্ত আছেন।
বিজিবির ১৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম এক প্রেস নোটে জানান, সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে নো ম্যান্স ল্যান্ডের ভারতীয় অংশের ৫০ গজ অভ্যন্তরে অবস্থান করছিলেন ওই ২৮ জন। কিন্তু শনিবার ভোর থেকে তাদের আর দেখা যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, রাতের কোনো একসময় বিএসএফ তাদেরকে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়েছে। ১৬ ব্যাটালিয়নের আওতাধীন পুরো সীমান্ত এলাকায় বিজিবির সার্বক্ষণিক নজরদারি ও টহল জোরদার রয়েছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে সীমান্ত পিলার ২০৩/৬-আর সংলগ্ন এলাকা দিয়ে ওই ২৮ জনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফের ১২ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর ক্যাম্পের সদস্যরা। ওই ২৮ জনের মধ্যে ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী ও ছয় শিশু রয়েছে।
নওগাঁ সিমান্তে পুশইনের শিশুসহ ১৭ জন কোথায় ?
নওগাঁর সাপাহার সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের পতাকা বৈঠকেও সমাধান না হওয়ায় শুক্রবার সারাদিন শূন্য রেখায় মানবেতর দিন কাটিয়েছেন পুশইন হওয়া শিশু ও নারী-পুরুষসহ ১৭ জন। তবে রাতের আঁধারে তারা কোথায় গেছেন, তা স্থানীয়রা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। বিজিবির করমুডাঙ্গা বিওপির নায়েব সুবেদার মিজানুর রহমান মৌখিকভাবে জানিয়েছেন, শনিবার রাত দুইটার দিকে তাদের ভারতে পুশব্যাক (ফিরিয়ে দেওয়া) করা হয়েছে।
শুক্রবার (৫ জুন) সকাল আটটার দিকে সাপাহারের হাঁপানিয়া সীমান্তের ২৩৮/এমপি সীমান্ত পিলার দিয়ে ভারতের ৮৮ বিএসএফ পান্নাছড়া ক্যাম্পের সদস্যরা ওই ১৭ জনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জোর করে প্রবেশ করায়।
সাপাহারের চৌমুহনী বাজারের রবিউল ইসলাম জানান, সংবাদ পাওয়ার পর হাঁপানিয়া বিওপির টহল দল সীমান্ত থেকে আট কিলোমিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দীঘিরহাট বাজার থেকে তাদের আটক করে চকচকি সীমান্তে পাঠায়। বিজিবির তাৎক্ষণিক তৎপরতায় তারা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে প্রবেশ করতে পারেননি। পুশইনের শিকার কয়েকজন তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ফোনে কথা বলায় স্থানীয়রা নিশ্চিত হয়েছেন যে তারা বাংলাদেশের নাগরিক।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ফজলুল হক জানান, পুশইনের শিকার সবার বাড়ি খুলনা, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, নড়াইল, বাগেরহাট ও যশোর এলাকায়। তিনি শুনেছেন, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে তাদের আত্মীয়-স্বজনরা এই এলাকায় এসেছিলেন। সকালে ওই এলাকায় কাউকে পাওয়া যায়নি।
নওগাঁ ব্যাটালিয়ন (১৬ বিজিবি) সূত্রে জানা যায়, এই ১৭ জনের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, ছয়জন নারী এবং পাঁচ শিশু রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি জানান, তারা বাংলাদেশের নাগরিক হলেও এভাবে অমানবিক উপায়ে পুশইন না করে, রাষ্ট্রীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে যেন হস্তান্তর করা হয়। ভারত যেটা করছে, তা সম্পূর্ণ জোর করে ও অমানবিক।
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য বিজিবি ১৬ নওগাঁ ব্যাটালিয়নের অধিনায়কের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
