ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে ছাত্রলীগের হামলায় আহত সানজিদা আহমেদ তন্বীর সম্মানে একটি পদ ফাঁকা রেখেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সানজিদা ১৮ আগস্ট ডাকসু নির্বাচনে গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে মনোনয়ন জমা দেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী। তিনি ওই বিভাগে স্নাতকে মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন।
বুধবার (২০ আগস্ট) প্যানেল ঘোষণার সময় রাকিবুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হামলায় আহত সানজিদা আহমেদ তন্বীর সম্মানে গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদটি শূন্য রেখে তাঁকে সমর্থন জানাচ্ছে ছাত্রদল। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে ছাত্রদল এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ছাত্রদলের পাশাপাশি তন্বীর সম্মানে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ এই পদটিতে প্রার্থিতা ঘোষণা করেনি।

তবে, সানজিদা আহমেদ বলেছেন, ছাত্রদল, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদসহ যেসব সংগঠন আমাকে সম্মান জানিয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তবে আমি লড়াই করেই জিততে চাই।
তন্বী ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ডাকসুতে গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে প্রার্থী না রেখে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, ছাত্রদলসহ যেসব সংগঠন আমাকে সম্মান জানিয়েছে, আমাকে এই পদের জন্য যোগ্য মনে করেছে ও আমার ওপরে বিশ্বাস রেখেছে যে, আমি এই পদে নির্বাচিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবো, তাদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। ছাত্রদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি লেখেন, আমি শিক্ষার্থীদের ভোটে জিততে চাই। তাদের হয়ে কাজ করতে চাই।
গবেষণা ও প্রকাশনা পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কারণ হিসেবে তন্বী বলেন, গবেষণায় আমার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা। আমার স্নাতক পর্যায়ের একটি রিসার্চ পেপার এরিমধ্যে নামকরা একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে পাবলিকেশনের অপেক্ষায়। ঢাকার চারশ'র মতো স্কুলশিক্ষকদের নিয়ে এই রিসার্চ করেছি। মাস্টার্সেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমার গবেষণার কাজ চলমান। এরিমধ্যে রিসার্চটি জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কাজ করতে চাই।

২০২৪ সালের ১৫ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় নৃশংস হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এ হামলায় আহতদের একটি বড় অংশ ছিল নারী শিক্ষার্থী। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাদের টার্গেট করে পিটিয়েছে। এ হামলায় আহত এক নারী শিক্ষার্থীর রক্তাক্ত চেহারার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়।
সেই ছবিতে ছাত্রলীগের বর্বতার চিত্র তুলে ফুটে ওঠে এবং এটি দেশজুড়ে মানুষের মনে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। ছাত্রলীগের হামলায় রক্তাক্ত ওই শিক্ষার্থীর নাম সানজিদা আহমেদ তন্বী।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। এ বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।

সানজিদা আহমেদ তন্বীর বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায়। তার বাবার নাম মেজবাহউদ্দিন আহমেদ, মায়ের নাম সাহানারা বেগম। স্থানীয় এক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি শেষে তিনি মাদারীপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নন। সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরের সামনে ছাত্রলীগের হামলায় রক্তাক্ত হন তন্বী। তার ওই রক্তাক্ত ছবি হাতে নিয়ে অনেকে আন্দোলনে নামেন।
সানজিদা আহমেদ তন্বী বলেন, ছাত্রলীগের সবার চোখে মুখে যে পরিমাণ হিংস্রতা ছিল, ওরা মানুষ হিসেবে আমাদেরকে দেখছিল না। মেয়ে হিসেবে তো দুরের কথা। কে ব্যাথা পাচ্ছে, কার কি ক্ষতি হবে, কার কোথায় আঘাত লাগছে এটা ওরা হিসাব করছিল না।
ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হামলায় চোখে গুরুতর আঘাত পান তন্বী। রক্তাক্ত শরীরে হাসপাতালে গিয়েও পুনরায় হামলার ভয়ে ঠিক মত নিতে পারেননি চিকিৎসা।

সানজিদা আহমেদ বলেন, আমার মুখ থেকে বারবার রক্ত পড়ছে। ডাক্তার এসে বারবার মেডিসিন দিয়ে যাচ্ছে রক্ত পড়া যাতে বন্ধ হয়। চোখের নিচের যে পাতাটা, সেটা টেনে ধরে তারপর অপারেশন করতে হয়েছে। আমার বন্ধুরা বারবার বলছিল, জলদি কর। কারণ ওখানে আক্রমণ হওয়ার শঙ্কা ছিল।
তন্বীর মত আরও অনেকেই জুলাই অভ্যুথানে হামলার মুখে পড়েন। জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পানে দমন-পীড়নের শিকার হন নারী শিক্ষার্থীরা। শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও দুঃসহ সেই স্মৃতি এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের। এখনও দেখা যায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমার নাম তুলে আনার চেষ্টা করে। আমার বক্তব্য বা কথাকে ভিন্ন অ্যাঙ্গেলে বলার চেষ্টা করে।
