ডাকসু নির্বাচন: প্রচারের শেষ হিসাব কষছেন প্রার্থী ও শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৬:৪৩ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে শেষ দিনের প্রচার ও আলোচনায় উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ। শেষ দিনের প্রচারে আলোচনায় ছিলো জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীদের শপথ।  নির্বাচিত হলে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে গণতান্ত্রিক আচরণ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে শপথ নেন তারা।

অন্যদিকে, আর স্বাধীনতা বিরোধীদের ভোট না দেয়ার আহ্বান বাম ছাত্র সংগঠন সমর্থিত প্যানেল প্রতিরোধ পর্ষদের। প্রচারের শেষ দিনে পোস্টার-লিফলেট হাতে ভোট প্রার্থনা করছেন প্রার্থী এবং তাদের পক্ষের কর্মী-সমর্থকরা। কলাভবন সংলগ্ন ঐতিহাসিক বটতলায় সম্মিলিত শপথ পাঠ করেছে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল। আর বুথের নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। 

রোববার ছিলো ডাকসু নির্বাচনে প্রচারের শেষ দিন। তাই সকাল থেকেই প্রার্থীদের নিয়ে শেষ মুহূর্তের হিসাব নিকাশে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। ব্যক্তি ইমেজ ও ইশতেহারের পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অবদান ও পরের কর্মকাণ্ড মাথায় রেখে প্রার্থী বাছাই করবেন বলেও জানিয়েছেন ভোটাররা। তারা জানান, ক্যাম্পাস নিয়ে যাদের চিন্তা-চেতনা ও কর্মকাণ্ড তাদের কাছে ভালো লেগেছে, তাদেরকেই নেতা হিসাবে চান তারা।


 
জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সামনের বটতলায় অনুষ্ঠিত হয় ছাদ্রদলের শপথ অনুষ্ঠান। শপথবাক্য পাঠ করান ছাত্রদল মনোনীত সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান। এ সময় ডাকসু ও বিভিন্ন হল সংসদে ছাত্রদলের পূর্ণ প্যানেলের প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। শুরুতেই শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য গণরুম সংস্কৃতি, গেস্টরুম নির্যাতন, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং ভিন্নমতের ওপর নিপীড়ন ফিরে আসতে না দেয়ার অঙ্গীকার করা হয়।

দ্বিতীয় অঙ্গীকারে দেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার কথা বলা হয়। উল্লেখ করা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তঝরা দিনগুলোতে যেভাবে আমরা বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম এবং আমাদের অগ্রজেরা যেভাবে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ঠিক সেভাবেই দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বা জনগণের মুক্তির পথে যেকোনো কালো শক্তির বাধা প্রতিহত করতে আমরা দৃঢ় থাকব।

অন্যান্য অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে—ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, সম-অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে একটি নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করা; সব শিক্ষার্থীর জন্য আবাসিক হলে বৈধ আসন, সাশ্রয়ী মূল্যে পুষ্টিকর খাবার, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্নতা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সহজলভ্য পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা।

সাইবার বুলিং, গুজব, অপতথ্য ও ভুয়া সংবাদের মতো অনলাইন হুমকি থেকে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং শিক্ষা, গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক পরিবেশের মানোন্নয়ন, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের প্রসার এবং ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ বৃদ্ধি করে বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কথাও বলা হয়েছে অঙ্গীকারে।

প্রচারের শেষ দিনে, হাসপাতাল থেকে ফিরে মধুর ক্যান্টিনে মতবিনিময় করেন মেঘমল্লার বসু। মধুর এ সময় হুইলচেয়ারে বসে স্বাধীনতা বিরোধীদের ভোট না দেয়ার আহবান জানান তিনি। বলেন, আপনারা ভোট দিতে এলেই গোটা ইকুয়েশন বদলে যাবে। যে সমীকরণ করা হচ্ছে তা কিছু দাঁড়াবে না। এখানে স্বাধীনতা বিরোধীরা একটা পোস্টেও জিতে আসতে পারবে না।

মেঘমল্লার বসু বলেন, প্রচারণার শেষ দিনে এসে এক অদ্ভুত সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা প্রচারণা শেষ করছি। আমার এই উপস্থিত যদি সহযোদ্ধাদের মনে একটুও প্রেরণা যোগায় তাহলে এটাই আমার প্রাপ্তি হবে। গত ১ সেপ্টেম্বর অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশনের জন্য পান্থপথের হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি হন মেঘমল্লার বসু। এরপর তিনি আজ মধুর ক্যান্টিনে একটি সংবাদ সম্মেলন করলেন। 

নিজের প্যানেলের প্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’র সহযোদ্ধাদের বলবো, ৯ তারিখে নির্বাচনের ফলাফল যাইহোক আমরা ইতোমধ্যেই জিতে গেছি। জিতে গেছি এই কারণে যে বাংলাদেশে যখন আমরা দেখতে পাই, একটার পর একটা মাজার ভাঙা হয়, মৃতদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয়া হয়, মবের পর মব হয়, মোরাল পুলিশিং হয় তখন আমাদের কারণেই প্রতিক্রিয়াশীলদের বলতে হচ্ছে, মেয়েদের হল ১২টা পর্যন্ত খোলা রাখতে হবে, ধর্মকেন্দ্রিক বিভাজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলবে না।

সব শিক্ষার্থীদের ভোট দিতে আসার আহ্বান জানিয়ে মেঘমল্লার বলেন, আপনারা যাকে খুশি তাকে ভোট দিন, কিন্তু ৯ তারিখ প্লিজ প্লিজ ভোট দিতে আসুন। আপনারা ভোট দিতে আসলে সব ইকুয়েশন বদলে যাবে। সকল সমীকরণ বদলে যাবে। এখানে স্বাধীনতা বিরোধীদের একটা পোস্টও উঠে আসতে পারবে না।

অন্যদিকে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়েছে ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেল ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট। এই জোটের ভিপি প্রার্থী আবু সাদিক কায়েম সাংবাদিকদের বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের ডোর টু ডোর যেতে চাই, তাদের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার কথা শুনতে চাই। কোন বড় নেতা এলাকার বাইরে থেকে ফোন দিয়ে ভোট দিতে বাধ্য করা একটি ফ্যাসিবাদী কায়দা।

তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে আমরা কনফিডেন্ট, তারা সৎ, দক্ষ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন। কেউ কাউকে ফোন দিয়ে ভোট দিয়ে বাধ্য করা, কাউকে পরিচিত করা, এ ধরনের কাজ যারা করছেন, প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের ক্ষতি করছেন।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করে বলেন, ডাকসু নির্বাচন কমিশন অপেশাদার আচরণ করছে। আমরা অনেকগুলো অভিযোগ দিয়েছি তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। আমরা নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ার কথা বলছি কিন্তু বহিরাগতদের এনে কিভাবে নিরাপদ ক্যাম্পাস হবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে সাদিক কায়েম বলেন, প্রতি বছর ক্যাম্পাসে যেভাবে পরীক্ষা হয়, ডাকসুকেও আমরা ক্যালেন্ডারের মতো নিয়মিত করব। প্রতি বছর যেন একই সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেই কাজ করব। ডিপার্টমেন্টে ভালো রেজাল্ট ও একাডেমিক উৎকর্ষতা যার থাকবে, তাদের নিয়োগের ব্যবস্থা করব। অতীতে রাজনৈতিক মতাদর্শের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে-এটা বন্ধ করব।

তিনি শিক্ষার্থীদের আবাসন, খাবার ও স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ‘আবাসন সংকট দীর্ঘমেয়াদি। এ সংকট নিরসনে হল নির্মাণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বাধ্য করব। স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করব। যে আশা নিয়ে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম, সেই আশা পূরণ করব।

এদিকে, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। ক্যাম্পাসের প্রবেশ পথ বন্ধ না করে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি ১০ টি দাবি জানায় তারা।

রোববার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক নেটওয়ার্কের নেতারা বলেন, ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছিল নির্বাচন পুরোপুরি সুষ্ঠু হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবারের নির্বাচনের আগেই নানা প্রস্তাব ও দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে দুই-একটি বাস্তবায়িত হলেও গুরুত্বপূর্ণ একাধিক বিষয় এখনও উপেক্ষিত। সেগুলোর বিষয়েও প্রশাসনকে নজর দেয়া জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের উত্থেপিত ১০ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- প্রবেশপথ বন্ধ না করে কেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে ও প্রবেশপথে দায়িত্বপ্রাপ্তদের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে, নারী ভোটার যাচাইয়ে নারী শিক্ষকদের দায়িত্ব দিতে হবে, পোলিং অফিসার নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, ভোট গ্রহণের সময় বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাড়াতে হবে, পোলিং এজেন্টদের ভেতরে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে, গণমাধ্যমকর্মী ও এজেন্টদের জন্য গাইডলাইন প্রকাশ করতে হবে, বুথের বাইরে লাইন ব্যবস্থাপনায় শিক্ষক ও অফিসার নিয়োগ, গুজব বা আতঙ্ক ছড়ালে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, পর্যবেক্ষক ও এজেন্টদের জন্য বিশ্রামকক্ষ নির্ধারণ করতে হবে, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা থাকলে প্রশাসনকে জবাবদিহি করতে হবে।

একাত্তর/এসি
টাইমলাইন: ডাকসু নির্বাচন-২০২৫
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৯:৩০
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৮:৪৩
ডাকসু নির্বাচন: প্রচারের শেষ হিসাব কষছেন প্রার্থী ও শিক্ষার্থীরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ৮৮ হাজার ব্যালট পেপার বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন নীলক্ষেতের একটি মার্কেটে ছাপানোর কথা স্বীকার করেছেন উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমেদ খান। তিনি...
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন-২০২৫ পরবর্তী সময় প্রার্থীদের বিভিন্ন আবেদন ও অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের অবস্থান জানিয়েছে। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা।
ছাত্রদলের প্যানেল থেকে অংশ নেয়া এই ভিপি প্রার্থী বলেন, ব্যালেটে কোনো ক্রমিক নম্বর ছিলো না। অনিরাপদ কারখানা থেকে ব্যালট পেপার ছাপানোর সুযোগে ডাকসুতে কারচুপি হয়েছে।
দীর্ঘ ১৮ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে দেশে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, তাকে অর্থবহ করতে না পারলে এবং জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে সঠিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে দেশের গণতন্ত্র বড়ো ধরনের হুমকির মুখে...
ফুটবল দর্শনের এক কঠিন ও স্নায়ুচাপের লড়াই শেষে আবারও ফুটবলের রাজসিংহাসনে বসলো স্পেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ন্ত্রণ বনাম বিশৃঙ্খলার এক ধুন্ধুমার লড়াই প্রত্যক্ষ করলো ফুটবলবিশ্ব। যেখানে লুইস দে লা...
করোনাকালে রোগীদের নমুনা পরীক্ষা না করেই ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া ও প্রতারণার দায়ে দেশজুড়ে আলোচিত রিজেন্ট গ্রুপ ও রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে আবারও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মশা নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত যেসব রাসায়নিক বা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে, তা খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর