অস্কার জয়ী কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ১০৪তম জন্মদিন আজ। ১৯২১ সালের দুই মে তার জন্ম কলকাতা। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে তার ছিল আত্মিক সম্পর্ক। তার পূর্ব পুরুষরা ছিলেন বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার বড় মসুয়া গ্রামের অধিবাসী।
তার পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর জন্ম বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে। উপেন্দ্রকিশোর ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে তৎকালীন প্রবেশিকা বা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তিও পেয়েছিলেন। তারপর কলকাতায় গিয়ে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। তিনি কলকাতায় চলে গেলেও বাংলাদেশের সঙ্গে তার যোগাযোগ থেকেই যায়। সেই সূত্রে সত্যজিৎ রায়ের বাবা সুকুমার রায়ের বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছিলো। সত্যজিৎ রায়ের জন্মের ছয় বছর আগে মারা যান উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, আর মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারান সত্যজিৎ। তারপরও বাংলাদেশের সঙ্গে ছেদ পড়েনি তাদের। কারণ তার মামারবাড়ি ছিল ঢাকার ওয়ারীর র্যাংকিং স্ট্রিটে।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সত্যজিৎ রায় সিনেমা ছাড়াও নানা ক্ষেত্রে নিজের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে বিবিসির জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি তালিকায় তিনি ১৩তম স্থান লাভ করেছিলেন।
সত্যজিৎ রায় কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একজন কর্মাশিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে। ১৯৪৩ সালের এপ্রিল মাসে ব্রিটিশ পরিচালিত বিজ্ঞাপন সংস্থা ডিজে কিমারে যোগদান করেন। সেখানে তিনি ১৩ বছর কাজ করেন সত্যজিৎ। জুনিয়র ভিজ্যুয়ালাইজার হিসেবে যোগদান করে পরে পদোন্নতিও হয়।
বহু বিজ্ঞাপনের ফন্ট এবং নকশা নিজে হাতে এঁকেছেন সত্যজিৎ রায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিনেমা হল নন্দনের লোগোও সত্যজিৎ রায়ের তৈরি। বিজ্ঞাপন জগতের পরিচিত চারটি ফন্ট রে রোমান, রে বিজার, ড্যাফনিস এবং হলিডে স্ক্রিপ্ট তারই তৈরি। এছাড়াও বহু বাংলা ফন্ট তার আবিষ্কার।
পথের পাঁচালী তৈরি করার ভাবনা ডি জে কিমারের অফিসে কাজ করতে করতেই সত্যজিৎ রায়ের মাথায় আসে। তখন ডি কে গুপ্তের সিগনেট প্রেস নামে একটি প্রকাশনা সংস্থার জন্য আম আঁটির ভেঁপুর প্রচ্ছদ আঁকতে হয়েছিল তাকে। তখনই বিভূতিভূষণের লেখা মুগ্ধ করে তাকে।
পথের পাঁচালী তৈরির জন্য টানা আড়াই বছর সময় লেগেছিল সত্যজিৎ রায়ের। লেখার কপিরাইট জোগাড় ও টাকা জোগাড়ের সময়কাল ধরলে তা প্রায় পাঁচ বছরের কাছাকাছি। পথের পাঁচালী আগস্ট মাসে মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার পরেই ইতিহাস গড়েছিল এই সিনেমাটি।

সুরকার হিসেবেই সত্যজিৎ রায় ছিলেন ভীষণ দক্ষ। প্রথম দিককার কিছু সিনেমা বাদ দিলে তাঁর বেশিরভাগ সিনেমায় নিজেই গান লিখেছিলেন সত্যজিৎ। এমনকী সুরও দিয়েছিলেন বেশিরভাগ গানে। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সুরধারার মিশেল ঘটেছিল তার গানে।
পথের পাঁচালী, পরশ পাথর এবং অপুর সংসারের সঙ্গীত রচনা করেছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। একবার দ্য টেলিগ্রাফে এক সাক্ষাৎকারে রবিশঙ্কর বলেছিলেন, চ্যাপলিন এবং রায়ই একমাত্র চলচ্চিত্র নির্মাতা যাদের সঙ্গীতের উপর পূর্ণ দক্ষতা ছিল।
সত্যজিতের লেখা বইতে সব স্কেচই তার আঁকা। তার সমস্ত প্রধান চরিত্রের একটি মুখ তিনি নিজেই এঁকেছিলেন। শুধু বইয়ের ছবি আঁকা নয়, শুটিংয়ের আগে তিনি বিভিন্ন দৃশ্য, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, চরিত্রের পোশাকআশাকও স্কেচ করতেন।
১৯১৩ সালে সত্যজিৎ রায়ের ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পারিবারিক প্রকাশনা ইউ. রে অ্যান্ড সন্স শিশু পত্রিকা সন্দেশ প্রকাশ শুরু করেন। মাঝে সেটি বন্ধ ছিল বেশ কিছু বছর। ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায় ও সুভাষ মুখোপাধ্যায় যৌথভাবে ফের ওই পত্রিকা সম্পাদনার কাজ শুরু করেন।
সত্যজিৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান বিশ্বভারতীর ছাত্র ছিলেন। নন্দলাল বসু এবং বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায়ের মতো বিখ্যাত শিল্পীদের অধীনে প্রাচ্য শিল্প ও ভারতীয় ভাস্কর্যের তালিম নেন। অজন্তা, ইলোরা এবং এলিফ্যান্টা গুহাগুলির ভাস্কর্য তাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছিল।
সত্যজিৎ রায় মোট ৩৭ টি ছবি পরিচালনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- অপরাজিত, পরশপাথর, জলসাঘর, অপুর সংসার, দেবী, তিনকন্যা, কাঞ্চনজঙ্ঘা, অভিযান, মহানগর, চারুলতা, গুপী গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে, অরণ্যের দিনরাত্রি, অশনি সংকেত, জয়বাবা ফেলুনাথ, সোনার কেল্লা, ঘরে-বাইরে, গণশত্রু, শাখা-প্রশাখা, আগন্তুক।
১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন এই মহান চলচ্চিত্রকার।
