তুরস্ক ও সিরিয়া সীমান্তের বিস্তৃণ অঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা এরই মধ্যে ৪১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে তুরস্কেই মারা গেছে প্রায় ৩৫ হাজার ৪১৮ জন। অন্যদিকে সিরিয়াতে প্রাণহানির সংখ্যা ৫ হাজার ৮০০। ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়াচ্ছে লাশের গন্ধ।
বিধ্বংসী ভূমিকম্পের ৯ দিন পরও দক্ষিণ তুরস্কে ধ্বংসস্তূপের নীচে থেকে শোনা যাচ্ছে মানুষের আর্তনাদ। মঙ্গলবার ধ্বংসস্তূপ থেকে ৯ জন উদ্ধার হয়েছে। আরও মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। যারা তীব্র ঠান্ডায় ধ্বংসাবশের মধ্যে কোনও খাবার ও পানীয় ছাড়াই বাঁচার জন্য লড়ছেন।

উদ্ধারকর্মী সালাম আলদিন বৃটিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, আমি জীবনে এত মৃত্যু ও এত লাশ দেখিনি, ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, দৃশ্যগুলো ‘আর্মাগেডন’ মুভির মতো, এটা অবিশ্বাস্য। পুরো শহর জুড়ে যেন মৃত মানুষের পঁচা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
সালাম আলদিনের বলা কথাই এখন তুরস্ক-সিরিয়ার দৃশ্যপট। একদিকে চলছে উদ্ধার অভিযান। অন্যদিকে চলছে বেঁচে যাওয়াদের কঠিন জীবন সংগ্রাম। প্রচণ্ড ঠান্ডা আবহাওয়ার সঙ্গে আবাসন এবং খাদ্য এ চিকিৎসা সংকটের মুখে আছে সেখানের লাখো মানুষ।

শত বাধা আর কষ্ট উপেক্ষা করে উদ্ধারকারীরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত কিংবা মৃত সবাইকে বের করে আনতে। তবে এখনও হাজার হাজার মানুষ চাপা পড়ে থাকায় মৃতের সংখ্যা দ্বিগুণ বা তারও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা জাতিসংঘের।
উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে, প্রায় ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে খুঁজে মঙ্গলবার ১৭ ও ২১ বছর বয়সি দুই ভাইকে উদ্ধার করা হয়েছে, এদিন আরও একজন নারী ও পুরুষকে উদ্ধার করা হয়। তবে তারা বলছেন ক্রমেই জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা শেষ হয়ে আসছে।

কার্যত এখন এখন মৃত্যুপুরী তুরস্ক এবং সিরিয়া। চারদিকে শুধুই হা হা কার, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে রয়েছে মৃতদেহ। জমছে লাশের স্তূপ। শহরের কবরস্থান আগেই ভরে গেছে। লাশ দাফনের জন্য নিত্য নতুন কবর খুঁড়ছে প্রশাসন। গণকবরও দেয়া হচ্ছে। তবে ফুরিয়ে এসেছে সেই ঠাঁইও।
তুরস্কের মারাশ শহরে গত কয়েক দিনের ছবিটা ঠিক এমনই। শহরে পাঁচ লক্ষ মানুষের বাস। সেখানে মরদেহ দাফনের কয়েকটি কবরস্থান রয়েছে। কিন্তু ভূমিকম্পের পর সেখানে আর তিল ধারণেরও ঠাঁই নেই। অথচ প্রতিদিনই ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে বের হচ্ছে মানুষের লাশ।

এমন পরিস্থিতিতে মরদেহের ভিড় সামাল দিতে নগর প্রশাসনের তরফে শহরেই অন্য আরেকটি স্থান মরদেহ দাফনের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু যতো দিন যাচ্ছে, সেখানেও ভিড় বাড়ছে, ফুরিয়ে আসছে ঠাঁই। শেষ ঠিকানার জন্যও লড়তে হচ্ছে মৃতদের।
ভূকম্পের থেকে তুরস্ক ও সিরিয়ার কবরস্থানে শুরু হয়েছে লাশবাহী গাড়ির ঘন ঘন আনাগোনা। মৃত্যু মিছিল যেন শেষ হতেই চাইছে না। ধ্বংসস্তূপ সরালেই, একের পর এক দেহ বেরিয়ে আসছে। মৃত্যু আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সেখানকার প্রশাসনের।

এদিকে, স্বজনহারানো পরিবারগুলোর অভিযোগ, তাঁরা বুঝতে পারছেন কোথায় তাঁদের আত্মীয়রা আটকে রয়েছেন। কিন্তু উদ্ধারকারী দল সে অঞ্চল খনন করে তাদের উদ্ধার করে আনছে না বলে অভিযোগ করেছেন তারা। আর উদ্ধারকারীরা বলছেন, তাদের কেউই আর বেঁচে নেই।
উদ্ধারকারী দলের কর্মকর্তারা বলেন, কম্পনে বিপর্যস্ত শহরগুলোর এমন কিছু স্থানে ধ্বংসস্তূপের নীচে মানুষ আটকে রয়েছে যে, সেখান থেকে তাঁদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা আর সম্ভব নয়। তাদের আরও দাবি, জীবিতদের উদ্ধার করাই বাহিনীর অগ্রাধিকারের মধ্যে ছিলো।
ভূমিকম্পে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে তুরস্কের একটা বড় অংশ। ধ্বংসস্তূপের তলায় প্রাণের সাড়া পেলে তবেই উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে দুর্যোগ মোকাবেলা বাহিনী। দুর্ঘটনার প্রায় দশ দিন কেটে যাওয়ার পর আটকে পড়া আর কারও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দেখছে না তারা।

ফলে বেঁচে থাকা মানুষের খোঁজ থেকে ভূমিকম্পের কারণে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলার দিকে উদ্ধারকারী দলগুলো দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে। বেঁচে যাওয়া অনেক গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। তবে তীব্র শীতের মধ্যে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন ভূমিকম্প কবলিত এলাকার মানুষ।
ভূমিকম্পে দুই দেশে সত্তর লাখের বেশি শিশু আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। তুরস্কে যে ১০ প্রদেশে ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে, সেই ১০টি প্রদেশে ৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন অর্থাৎ ৪৬ লাখের মতো এবং সিরিয়ায় এ সংখ্যা আড়াই মিলিয়ন অর্থাৎ ২৫ লাখ।
১২ বছরের গৃহযুদ্ধে জর্জরিত সিরিয়া বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে কীভাবে সহায়তা বাড়ানো যায়, তা নিয়ে সোমবার জরুরি বৈঠক করেছে জাতিসংঘ। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ অবকাঠামো পুননির্মাণে আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছেন।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি ভোরে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। প্রাথমিক উদ্ধার তৎপরতায় সমস্যা থাকার কথা স্বীকার করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তবে তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে আছে।
৪৫ সেকেন্ডের ভূমিকম্পের পর আরও দু’হাজার তিনশ’র বেশি পরাঘাত হয়েছে বলে জানিয়েছে ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা। এতে যেসব ভবন এখনও অক্ষত আছে সেগুলোর স্থায়িত্ব নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দলকে বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে অভিযান চালাতে হচ্ছে।
একাত্তর/এআর
