যুক্তরাষ্ট্রের আদালত জেফরি এপস্টাইন সংক্রান্ত ৩০ লক্ষাধিক নথি প্রকাশের পর ব্রিটিশ রাজনীতি থেকে শুরু করে রাজপরিবারে এক বিশাল ভূকম্পন সৃষ্টি করেছে। এই নথিপত্রে ব্রিটেনের তিন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব-সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু, তার প্রাক্তন স্ত্রী সারাহ ফার্গুসন এবং সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনের নাম বারবার উঠে এসেছে। এর ফলে তাদের ওপর জনচাপ যেমন বেড়েছে, তেমনি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও তাদেরকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে ব্রিটিশ রাজপরিবার ও সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠতার নতুন তথ্য সামনে আসায় ব্রিটেনজুড়ে নিন্দার ঝড় বইছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সরাসরি প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং পিটার ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করলেও নতুন নথিগুলো সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুর দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।প্রকাশিত নথিতে অ্যান্ড্রুর তিনটি ছবি পাওয়া গেছে, যেখানে তাকে মেঝেতে শুয়ে থাকা একজন নারীর ওপর ঝুঁকে থাকতে দেখা যাচ্ছে। যদিও ছবিগুলোর সময়কাল বা প্রেক্ষাপট অস্পষ্ট, তবে এগুলো জনমনে নতুন করে ঘৃণার জন্ম দিয়েছে।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ অ্যান্ড্রুকে ওয়াশিংটনে এসে সাক্ষ্য দেওয়ার অনুরোধ করেছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও অ্যান্ড্রুকে তদন্তে সহযোগিতা করার এবং মার্কিন কংগ্রেসের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তথ্য থাকলে তা শেয়ার করতে দ্বিধা করা উচিত নয়।
২০১০ সালের একটি ইমেলে দেখা যায়, এপস্টাইন অ্যান্ড্রুকে ২৬ বছর বয়সী এক সুন্দরী ও ‘বিশ্বস্ত’ রুশ তরুণীর সাথে ডিনারে দেখা করার প্রস্তাব দিচ্ছেন, যা অ্যান্ড্রু সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন।
অ্যান্ড্রুর প্রাক্তন স্ত্রী সারাহ ফার্গুসন এবং এপস্টাইনের সম্পর্ক কেবল বন্ধুত্বের চেয়েও গভীর ছিল বলে নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ২০১০ সালের একটি ইমেলে সারাহ এপস্টাইনকে ‘কিংবদন্তি’ হিসেবে সম্বোধন করেন এবং রসিকতা করে বলেন, আমাকে বিয়ে করো। তিনি এপস্টাইনকে তার হারানো ‘ভাই’ হিসেবেও অভিহিত করেছিলেন। ২০০১ সালে এপস্টাইন সারাহকে ১,৫০,০০০ ডলার পাঠিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এছাড়া ২০০৯ সালে ভাড়ার টাকা পরিশোধের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ২০,০০০ পাউন্ড সাহায্যও চেয়েছিলেন সারাহ।

এই কেলেঙ্কারির জের ধরে সারাহর নিজস্ব চ্যারিটি সংস্থা ‘সারাহ’স ট্রাস্ট’ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম কুশলী ব্যক্তিত্ব পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়ে অভিযোগগুলো সবচেয়ে গুরুতর। ২০০৯ সালে বিজনেস সেক্রেটারি থাকার সময় ম্যান্ডেলসন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের জন্য তৈরি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ট্যাক্স পলিসি এবং ২০ বিলিয়ন পাউন্ডের সম্পদ বিক্রির মেমো এপস্টাইনকে পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ম্যান্ডেলসনের জীবনসঙ্গী রেনাল্ডো আভিলা দা সিলভা নিয়মিত এপস্টাইনের কাছ থেকে মাসিক ভাতা এবং ঋণ হিসেবে বড় অংকের টাকা নিয়েছেন। এমনকি ম্যান্ডেলসন রসিকতা করে এপস্টাইনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুমি কি রেনাল্ডোর ভাতা বন্ধ করে দিলে?

চাপের মুখে ম্যান্ডেলসন লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এখন তাকে ‘হাউস অফ লর্ডস’ থেকে সরিয়ে দেয়ার এবং তার ‘লর্ড’ উপাধি কেড়ে নেয়ার দাবি তুলেছেন।
লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, নথিপত্র প্রকাশের পর তারা সরকারি অফিসে অসদাচরণের বেশ কিছু অভিযোগ পেয়েছে। এগুলো ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়ে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এপস্টাইন কেলেঙ্কারি শুধু ব্যক্তিদের সম্মানহানি করেনি, বরং ব্রিটিশ রাজতন্ত্র এবং সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।
