বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের সাথে তিন দিনব্যাপী এক ভয়াবহ লড়াই শেষে ড্রোন ও হেলিকপ্টার পাঠিয়ে একটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মরু শহরের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী। বুধবার পুলিশ জানিয়েছে, গত সপ্তাহের শেষভাগে শুরু হওয়া এই সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এই প্রদেশটি বহু বছর ধরেই অশান্ত। খবর রয়টার্স।
বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী 'বেলুচ লিবারেশন আর্মি' (বিএলএ) শনিবার যে সমন্বিত হামলার ঢেউ শুরু করেছিল, তাতে পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। প্রদেশের ডজনেরও বেশি স্থানে বিদ্রোহীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর টানা গোলাগুলি চলে, যাতে সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী ১৯৭ জন উগ্রবাদী নিহত হয়।
প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটার একটি সুরক্ষিত এলাকায় প্রশাসনিক ভবনের কাছে বসবাসরত গৃহবধূ রুবিনা আলী জানান, বুধবার সকালে এক শক্তিশালী বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। তিনি বলেন, আমার মনে হচ্ছিল আমার বাড়ির ছাদ আর দেয়ালগুলো এখনই উড়ে যাবে।
অত্র অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠী বিএলএ’র যোদ্ধারা বেলুচিস্তানজুড়ে স্কুল, ব্যাংক, বাজার এবং নিরাপত্তা স্থাপনায় নজিরবিহীন হামলা চালায়। এটি তাদের পরিচালিত এখন পর্যন্ত অন্যতম বৃহত্তম অভিযান, যেখানে ২২ জনেরও বেশি নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং ৩৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
গণমাধ্যমের সাথে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ কর্মকর্তারা এই পরিস্থিতির বিস্তারিত জানান।
প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জনপদ মরুশহর নুশকিতে বিদ্রোহীরা পুলিশ স্টেশনসহ অন্যান্য নিরাপত্তা স্থাপনা দখল করে নিলে তিন দিনের এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। পুলিশ জানিয়েছে, সোমবার গভীর রাতে শহরটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের আগে লড়াইয়ে সাতজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
প্রদেশের অন্যান্য স্থানে এখনো বিএলএ’র বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, নুশকিতে আরও সৈন্য পাঠানো হয়েছে এবং জঙ্গিদের বিরুদ্ধে হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। তবে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া দেয়নি।
গভীর রাতের হামলা খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের বৃহত্তম ও দরিদ্রতম প্রদেশ বেলুচিস্তানের সীমান্ত ইরান ও আফগানিস্তানের সাথে লেগে আছে। এখানেই গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দরসহ চীনের বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প অবস্থিত। কয়েক দশক ধরে জাতিগত বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এই অঞ্চলে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের বৃহত্তর হিস্যার দাবিতে বিদ্রোহ চালিয়ে আসছে।
বিএলএ এই আন্দোলনকে সমর্থন করার জন্য প্রদেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তারা মঙ্গলবার দাবি করেছে, তাদের 'অপারেশন হেরোফ' (ব্ল্যাক স্টর্ম) চলার সময় ২৮০ জন সেনা নিহত হয়, যদিও তারা এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, শনিবার ভোর চারটায় নুশকি এবং মাছ ধরার বন্দর পাসনিতে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ এবং কোয়েটাসহ আরও ১১টি স্থানে বন্দুক ও গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে এই তাণ্ডব শুরু হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিদ্রোহীরা অন্তত ছয়টি জেলা প্রশাসনিক কার্যালয় দখল করে নিয়েছিল এবং এক পর্যায়ে কোয়েটায় প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল।
বিবর্তিত বিদ্রোহ গোষ্ঠির এই হামলার জন্য কোনো প্রমাণ ছাড়াই ভারতকে দায়ী করেছে পাকিস্তান। এ ধরনের অভিযোগ পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশীর মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, যারা গত মে মাসে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ইসলামাবাদের উচিত অত্র অঞ্চলের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো পূরণ করা। বেলুচিস্তানে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির রিয়াজ জানান, গত এক দশকে এই বিদ্রোহের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন ও বিবর্তন এসেছে।
