ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি বর্তমানে দেশটির পরবর্তী 'সর্বোচ্চ নেতা' নির্বাচনের আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় নিহত হওয়ার পর, তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়টি এখন তেহরানের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।
৫৩ বছর বয়সী হাসান খোমেনি হলেন মরহুম আয়াতুল্লাহ খোমেনির ১৫ জন নাতির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মুখ। ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মহলে তাঁকে একজন তুলনামূলক 'মধ্যপন্থী' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংস্কারপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি এবং হাসান রুহানির সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যাঁরা উভয়েই ক্ষমতায় থাকাকালীন পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক গড়ার নীতি অনুসরণ করেছিলেন।

রাজনৈতিক অবস্থান ও সাহসিকতা
হাসান খোমেনি বর্তমানে তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত তাঁর দাদার সমাধিসৌধের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারে সরাসরি কোনো দায়িত্ব পালন না করলেও তিনি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাবশালী। তিনি বহুবার সংস্কারের পক্ষে কথা বলেছেন এবং কর্তৃপক্ষের নানা সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন।
ভোটের অধিকারে সোচ্চার: ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সংস্কারপন্থী প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণা করায় তিনি গার্ডিয়ান কাউন্সিল বা অভিভাবক পরিষদের তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, আপনারা কাউকে পছন্দ করে দিয়ে আমাকে তাকে ভোট দিতে বলতে পারেন না!
মাহসা আমিনির মৃত্যুতে জবাবদিহি: ২০২২ সালে পুলিশি হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর তিনি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন।
ইসলামি শাসনব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য
সংস্কারপন্থী ইমেজ থাকলেও হাসান খোমেনি বর্তমান ইসলামি শাসনব্যবস্থার প্রতি অনুগত। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় তিনি খামেনি-বিরোধী স্লোগানের সমালোচনা করেছেন এবং বিক্ষোভকারীদের অনেককে ইসরাইলের সেবক হিসেবে অভিহিত করেছেন। খামেনির মৃত্যুর পর শোকবার্তায় তিনি তাঁকে 'জনগণের বীর' হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, ইরানের মানুষ আবারও ইমাম খোমেনির দেখানো পথে এই সংকট কাটিয়ে উঠবে।
একজন প্রগতিশীল ধর্মতাত্ত্বিক
তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের মতে, হাসান খোমেনি একজন প্রগতিশীল চিন্তাবিদ। সংগীত, নারী অধিকার এবং সামাজিক স্বাধীনতার বিষয়ে তিনি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তিনি ইংরেজি ও আরবি ভাষায় পারদর্শী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন এবং ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি পশ্চিমা দর্শনেও আগ্রহী।
বিগত দিনের বাধা ও সামরিক সম্পর্ক
১০ বছর আগে তিনি 'অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস' (সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনকারী পর্ষদ)-এর নির্বাচনে দাঁড়াতে চাইলেও ধর্মীয় পদের দোহাই দিয়ে গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংস্কারপন্থী শিবিরের প্রভাব ঠেকাতেই তাঁকে সেবার রুখে দেওয়া হয়েছিল।

ইরানের প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সাথে তাঁর সম্পর্ক বেশ জটিল। ২০০৮ সালে তিনি সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিলেও এই বাহিনীর সাথে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি গত বছরের ইসরাইল-ইরান বিমান যুদ্ধের সময় তিনি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের প্রশংসা করে খামেনিকে চিঠি লেখেন।
ইরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো খামেনির ছেলে মোজতাবাকে ক্ষমতায় দেখতে চাইলেও, জনগণের অসন্তোষ ও বর্তমান অস্থিরতার মুখে হাসান খোমেনির মতো একজন মধ্যপন্থী ব্যক্তিত্বকে ক্ষমতায় বসানোর বিষয়টি জোরে আলোচিত হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি তাঁর নমনীয় মনোভাব এবং জনগণের মধ্যে তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে এই পদের জন্য একজন শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
