মঙ্গলবার যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুঙ্কার দিচ্ছিলেন, ‘আজ রাতে একটি আস্ত সভ্যতা বিলীন হয়ে যাবে’, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে চলছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর কূটনৈতিক নাটক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন প্রকাশ্যে তেহরানকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন নেপথ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও আমেরিকার মধ্যে চলছিল এক গোপন সমঝোতার লড়াই। শেষ পর্যন্ত এক রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত থেকে বিশ্বকে ফিরিয়ে আনলো দুই সপ্তাহের এক যুদ্ধবিরতি চুক্তি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম আ্যক্সিওসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য দেয়া হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে যে, ঘটনার সূত্রপাত সোমবার সকালে। হোয়াইট হাউসে যখন ইস্টার উদযাপনের আমেজ, তখন ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ফোনে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছিলেন। ইরান থেকে আসা ১০ দফার একটি পাল্টা প্রস্তাব দেখে তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন এবং একে ‘বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেন। এরপরই শুরু হয় এক বিশৃঙ্খল দিন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা উইটকফ এবং ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে খসড়া আদান-প্রদান করতে থাকেন। মিশর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও এই অচলাবস্থা কাটাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
গোপন ডেরায় খামেনির সবুজ সংকেত: ইসরাইলি গুপ্তহত্যা এড়াতে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনেই বর্তমানে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন। তিনি মূলত চিরকুটের মাধ্যমে বার্তাবাহকদের ব্যবহার করে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকে এবারই প্রথম খামেনা তাঁর প্রতিনিধিদের একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য সরাসরি সবুজ সংকেত দেন। আরাগচি শুধু আলোচনার টেবিল সামলাননি, বরং ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কট্টরপন্থী কমান্ডারদেরও এই যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে রাজি করান। এমনকি চীনও ইরানকে যুদ্ধের পথ থেকে সরে আসার পরামর্শ দেয়।

ট্রাম্পের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও পেন্টাগনের প্রস্তুতি: মঙ্গলবার যখন চুক্তির পথে অগ্রগতি আসছিল, তখনও ট্রাম্প তাঁর সবচেয়ে ভয়ংকর হুমকিটি দিয়ে বসেন। ফলে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের কর্মকর্তারা ধন্দে পড়ে যান। যখন ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন, তার ঠিক ১৫ মিনিট আগেও মার্কিন বাহিনী ইরানের অবকাঠামোতে বিশাল বোমা হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমরা জানতাম না আসলে কী হতে যাচ্ছে, পুরো বিষয়টি ছিল পাগলামির মতো।
চুক্তির চূড়ান্ত মুহূর্ত ও ভ্যান্সের ভূমিকা: এই জটিল প্রক্রিয়ায় হাঙ্গেরি থেকে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। মঙ্গলবার দুপুর নাগাদ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে একটি সাধারণ ঐকমত্য তৈরি হয়। বিকেল নাগাদ পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক মাধ্যমে এই চুক্তির শর্তাবলী প্রকাশ করে উভয় পক্ষকে তা গ্রহণের আহ্বান জানান। ট্রাম্প তাঁর কট্টরপন্থী উপদেষ্টাদের বাধা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং পাকিস্তানি ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলে চুক্তিতে চূড়ান্ত সিলমোহর দেন।

পরবর্তী পদক্ষেপের লক্ষ্য: এই চুক্তির ফলে ইরান সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে রাজি হয়েছে, তবে শর্ত হলো তা হতে হবে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে। আগামী শুক্রবার পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় শান্তি আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন জে ডি ভ্যান্স। এটি তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
তবে শঙ্কা কাটেনি। ইসরাইল দাবি করছে, তারা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েছে, ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল পুরোপুরি ত্যাগ করতে বাধ্য করা হবে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন দাবি করছে, ট্রাম্পের কঠোর হুমকির কারণেই এই চুক্তি সম্ভব হয়েছে। ইরান যদি এই শর্তে রাজি না হয়, তবে দুই সপ্তাহ পর আবারও যুদ্ধের দামামা বাজার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তেহরান এখন ভাবছে, ট্রাম্পের এই হুমকি কি আসলেই শেষ, না কি এটি শুধু ঝড়ের আগের স্তব্ধতা?
