আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কি তবে অবসানের পথে, নাকি এক নতুন এবং আরও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিশ্ব? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্য এবং তেহরান-ওয়াশিংটনের পর্দার অন্তরালের কূটনৈতিক তৎপরতা এখন এই প্রশ্নটিকেই সবচেয়ে বড় করে তুলেছে। শনিবার বিকেলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উপসাগরীয় এবং আঞ্চলিক নেতাদের সাথে এক হাই-ভোল্টেজ বৈঠকে বসেন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল যুদ্ধ থামাতে ইরানের দেয়া সর্বশেষ প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা। বৈঠক শেষে মধ্যস্থতাকারীদের দাবি, উভয় পক্ষ একটি সম্ভাব্য চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক বা রূপরেখার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
তবে বরাবরের মতোই নিজের চিরচেনা আগ্রাসী মেজাজে আছেন ট্রাম্প। জনপ্রিয় মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস’কে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, উপসাগরীয় নেতাদের সাথে বসার আগে ইরানের সাথে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ‘সলিড ৫০/৫০’। রোববার বিকেলের মধ্যেই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন যে ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করবেন কিনা। তাঁর ভাষায়, এই আলোচনা হয়তো একটি ভালো চুক্তির দিকে যাবে, নয় তো যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে একবারে ‘বোমা মেরে উড়িয়ে দেবে।

পাক-কাতার মধ্যস্থতায় বরফ গলার আভাস: তেহরানে কাতার এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের টানা ২৪ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠকের পর বরফ গলার স্পষ্ট আভাস পাওয়া গেছে। আলোচনার অগ্রগতিকে ‘অত্যন্ত ইতিবাচক’ বলে বর্ণনা করেছেন মধ্যস্থতাকারীরা।
নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, আজকে বা আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের হয়তো বড় কোনো ঘোষণা দেয়ার থাকতে পারে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, যুদ্ধ শেষ করা, ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার দিকেই তেহরান মনোযোগ দিচ্ছে। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরানে দুই দিনের সফর শেষে এটিকে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে এই চুক্তিতে আপাতত ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিস্তারিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকছে না। চুক্তির খসড়ায় ৩০ এবং ৬০ দিনের দুটি সময়সীমা রাখা হয়েছে, যা আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হতে পারে। সবচেয়ে বড় বিরোধের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং হরমুজ প্রণালী। ইরান জানিয়েছে, হরমুজ নিয়ন্ত্রণ ও চলাচল ব্যবস্থা ওমান এবং প্রতিবেশি দেশগুলোর নিজস্ব বিষয়, এখানে আমেরিকার নাক গলানোর কোনো অধিকার নেই।

রিপাবলিকান বাজপাখি ও ইসরাইলের ঘুম হারাম: ট্রাম্প যখন শান্তির পথ খুঁজছেন, তখন মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেই তাঁর দলের কট্টর ইরানবিরোধী বা ‘বাজপাখি’ হিসেবে পরিচিত আইনপ্রণেতারা তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছেন। সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে আধিপত্য বজায় রাখে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের অবকাঠামো ধ্বংস করার ক্ষমতা ধরে রাখে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে দেবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইসরাইলের জন্য এক 'ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন' হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে, সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস না করে চুক্তি করলে তা ওয়াশিংটনের চরম দুর্বলতা হিসেবে প্রকাশ পাবে এবং এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কলঙ্কিত করবে।
এদিকে, ওয়াশিংটনে যখন এই তোলপাড় চলছে, তখন তেল আবিবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর শীর্ষ মন্ত্রী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিয়ে এক জরুরি ও সীমিত বৈঠক ডেকেছেন। ইরান চুক্তির এই অভাবনীয় মোড় ইসরাইলি প্রশাসনকে অস্বস্তিতে ফেলেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি: চুক্তির সুবাতাসের মধ্যেই আমেরিকার প্রতি চরম অবিশ্বাস ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি দেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এক বিবৃতিতে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধবিরতির এই সময়ে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী নিজেদের এমনভাবে পুনর্গঠিত করেছে যে, ট্রাম্প যদি আবার যুদ্ধ শুরু করার ভুল করেন, তবে তা আমেরিকার জন্য যুদ্ধের প্রথম দিনের চেয়েও অনেক বেশি বিধ্বংসী, চূর্ণ-বিচূর্ণকারী এবং তেতো স্বাদের হবে। ইরান তাদের দেশের অধিকার থেকে এক চুলও নড়বে না বলে তিনি সোজা জানিয়ে দেন।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন সুতোয় ঝুলছে। ট্রাম্প কি তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের পরামর্শে শান্তির পথে হাঁটবেন, নাকি লিন্ডসে গ্রাহামদের কথায় প্ররোচিত হয়ে আবারও পারমাণবিক যুদ্ধ শুরুর বোতামে চাপ দেবেন, তা নির্ধারণ করবে আগামী ৭২ ঘণ্টা।
তথ্যসূত্র: সিএনএন
