রাজধানীর বঙ্গবাজারে দানবীয় আগুনের উত্তাপ এখনো মিলিয়ে যায়নি সেখান থেকে। তবে এরিমধ্যে আগুনের ধোঁয়ার মতোই বাতাসে মিলিয়ে গেছে বহু মানুষের রুটিরুজির একমাত্র উপায়। নিভে গেছে অনেক স্বপ্নসাধ। সব কিছুই এখন ছাইয়ের মতো ধূসর।
দু’দিন আগেও বঙ্গবাজারের হাজার হাজার দোকানে শোভা পেতো রঙিন পলিথিনে মোড়ানো সারি সারি কাপড়ের ব্যাগ। আর এখন সেই সব কাপড়ের রঙ কালো। পুড়ে ছাই। চারিদিকে ধ্বংসস্তুপ আর হাহাকার। ব্যবসায়ীদের চোখে মুখে অনিশ্চিত জীবনের ছায়া।
নতুন কাপড়ের গন্ধের বদলে সেখানে শুধুই পোড়া গন্ধ। ঈদকে কেন্দ্র করে বড় বিনিয়োগ করা পুঁজির পোড়া স্তুপ এখন বঙ্গবাজার। নিঃস্ব কয়েক হাজার ব্যবসায়ী বুধবার সকাল থেকেই ছিলেন বঙ্গবাজারের বিরাণ ভূমিতে। পোড়া ছাইয়ের পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে।
এই ঈদে কারো পরনে থাকার কথা ছিলো যে শাড়ি; সেটি পড়ে আছে পোড়া স্তুপে। নগদ বাকির হিসাবটাও ছিল পাকাপাকি। তাও এখন ছিন্ন ভিন্ন। পাশেই যার চোখের পানিতে আরেকবার ভিজছিলো শাড়ির স্তুপ, তিনি এক দোকানের মালিক দ্বিন ইসলাম।
ফ্লাট বিক্রির পুরো টাকা তিনি বিনিয়োগ করেছিলেন ঈদের বাণিজ্যে। ঋণ ছিলো আরও ২৫ লাখ টাকা। দ্বিন ইসলাম এখন নিঃস্ব। এমন গল্প সেখানকার কয়েক হাজার ব্যবসায়ী। এদের কারো মাথায় ব্যাংক ঋণের চাপ, কেউ আবার বাকিতে পণ্য এনে এখন ঋণগ্রস্ত।
ঈদের মৌসুম। প্রতিদিনই মালামাল কিনতে হয়। এজন্য নগদ টাকা ব্যাংকে না রেখে দোকানেই রাখতেন রাজধানীর বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা। আগুনে মালামালের সঙ্গে তাদের নগদ টাকাও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পোড়া ছাইয়ের ভেতর টাকার সিন্দুক খুজছিলেন সোহাগ। জরুরি নানা কাগছ পত্রতো আছেই যদি থেকে যায় শেষ সম্বল কিছু নগদ টাকা।
নগদ সাত লাখ টাকা আগুনে পুড়ে শেষ ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন মেম্বারের। তিনি বলেন, নয় মাস আগে নতুন দোকান নিয়েছি। আজ সকালে কয়েক পার্টিকে মালের টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল। শুরুর আগেই সব কিছু শেষ। দোকানে নগদ সাত লাখ টাকা আর ছয় লাখ টাকার মালামাল ছিল। এখন কিছুই নাই। সর্বনাশা আগুন সব কেড়েছে।
সনিয়া গার্মেন্টসের দোকানি হৃদয় বলেন, মার্কেটে আমাদের তিনটি দোকান। তিনটাই পুড়ে ছাই। নিজের সাত লাখসহ ১২ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এবার ঈদে মাল উঠিয়েছিলাম। কিছুই নাই। ক্যাশে আড়াই লাখ টাকা ছিলো। ব্যাংক থেকে প্রতিদিন টাকা উঠাতে ঝামেলা দেখে দোকানেই টাকা রেখেছিলাম। এখন ছাই ছাড়া কিছু নাই।
বঙ্গবাজার ও আশপাশের মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, আগুনের ঘটনায় তারা এখন নিঃস্ব। ঈদ উপলক্ষে দোকানে লাখ লাখ টাকার মালামাল তুলেছিলেন। সেই মালামালের সঙ্গে নগদ টাকাও আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুন সব কিছুই নিয়ে গেছে।
এমন শত শত মানুষের কান্নায় ভারি ছিলো বুধবারের বঙ্গবাজার। একই পরিবারের পাঁচ জনের ব্যবসা ছিলো এখানে। নিঃস্ব পুরো পরিবার। বাকিতে ব্যবসা করতেন আরেক ব্যবসায়ী। পাওনা ৩০ লক্ষ টাকা কিভাবে তুলবেন জানেন না তিনিও।
ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, ঈদের আগে অস্থায়ী অবকাঠামো করে এখানে তাদের ব্যবসার সুযোগ দেয়া হোক। ব্যাংকের কিস্তি বা সুদ মাফ করারও দাবি তাদের। মালিক সমিতির দাবি সবমিলে আগুনে কমপক্ষে দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে।
বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতি সভাপতি লোকমান খান বলেন, মার্কেটে প্রায় তিন হাজার দোকান। ঈদে প্রতিটি দোকানে কমপক্ষে ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকার মাল থাকে। কোনও কোনও দোকানে ১০ কোটি টাকারও পুঁজি থাকে। এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবদার, দ্রুত আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে পুনর্বাসন করানো হোক।
একাত্তর/এআর
