ব্রাজিলিয়ান ক্লাব পালমেইরাসের একাডেমি যেন বিশ্ব ফুটবলের এক অফুরন্ত সোনার খনি! এনড্রিক, এস্তেভাও, লুইস গুইলহের্মে কিংবা ভিতোর রেইসদের মতো প্রতিভাদের চড়া দামে ইউরোপের ক্লাবগুলোর কাছে বেচে তারা আগেই নিজেদের একাডেমিকে ‘দ্য বিলিয়ন জেনারেশন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে পালমেইরাসের সেই কোটি টাকার ধনভাণ্ডারে এবার যুক্ত হয়েছে আরও একটি হীরের টুকরো, ১৬ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড এদুয়ার্দো কনসেইসাও।
এখনও ক্লাবের সিনিয়র দলের হয়ে অভিষেকই হয়নি তাঁর, অথচ ইউরোপের শীর্ষ পরাশক্তিরা এই কিশোরকে দলে ভেড়াতে এখনই একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বার্সেলোনা, পিএসজি, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, আর্সেনাল ও চেলসির মতো জায়ান্টরা ব্রাজিলের এই অনূর্ধ্ব-১৭ আন্তর্জাতিক তারকাকে পাওয়ার রেসে কোমর বেঁধে নেমেছে।

২০০৯ সালের ৭ ডিসেম্বর সাউ পাওলোতে জন্ম নেওয়া এদুয়ার্দোর ফুটবলের প্রতি হাতেখড়ি তাঁর বাবার হাত ধরে, যিনি নিজেও একজন ফুটবলার ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে অপেশাদার লিগ আর একাডেমিতে ঘুরে বেড়ানো এদুয়ার্দো মাত্র ৯ বছর বয়সে পালমেইরাসের ট্রায়ালে টিকেন।
মাত্র চার দিনের ট্রায়াল দেখেই ক্লাবের জহুরিরা চিনে নিয়েছিলেন এই রত্নকে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ক্লাবের বয়সভিত্তিক দলগুলোতে নিজের বয়সের চেয়ে অনেক বড়দের সাথে খেলে প্রতিনিয়ত নিজের জাত চিনিয়েছেন এই লিথাল ফরোয়ার্ড।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব-২০ দলগুলোর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট ‘কোপিনহা’-র স্কোয়াডে ডাক পেয়ে সবাইকে চমকে দেন এদুয়ার্দো। তবে, চমকের তখনও অনেক বাকি ছিল! গ্রুপ পর্বের নিজের দ্বিতীয় ম্যাচেই একাই ৪টি গোল এবং আরও ৩টি অ্যাসিস্ট করে স্টেডিয়ামে উপস্থিত স্কাউট এবং ফুটবল ভক্তদের মাথা ঘুরিয়ে দেন তিনি।

এই অতিপ্রাকৃতিক পারফরম্যান্সের ঠিক কয়েকদিন পরই পালমেইরাস তাঁর সাথে প্রথম পেশাদার চুক্তি সই করে। কোনো ঝুঁকি না নিয়ে ক্লাব কর্তৃপক্ষ চতুরতার সাথে তাঁর চুক্তিতে ১০০ মিলিয়ন ইউরোর (প্রায় ১১৮ মিলিয়ন ডলার) একটি রেকর্ড ব্রেকিং ‘বাই-আউট ক্লজ’ বা রিলিজ ক্লজ জুড়ে দেয়, যাতে ইউরোপের কোনো ক্লাব সহজে তাঁকে সস্তায় কেড়ে নিতে না পারে।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এদুয়ার্দো স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘এএস’-কে বলেন, অ্যাথলেট হিসেবে আমি আজ যা, তার সবটুকুই ক্লাবের অবদান। আমাদের একাডেমি পরিচালক জোয়াও পাওলো সাম্পাইওর কাজ পুরো দেশের জন্য একটা উদাহরণ। মাঠে আমার মূল্যায়ণ হচ্ছে দেখে আমি খুশি, এটি আমাকে প্রতিদিন আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা দেয়।
বর্তমানে পালমেইরাসের অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে ব্রাসিলেইরো ও কোপা লিবার্তোদোরেসে খেলার পাশাপাশি গত মাসে ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপে মাঠ কাঁপিয়েছেন এদুয়ার্দো। বলিভিয়ার বিপক্ষে ৫-০ গোলের জয়ে আসরের প্রথম গোলটি আসে তাঁর পা থেকেই। এরপর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩-০ গোলের বিধ্বংসী জয়েও জালের দেখা পান তিনি। টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে কলম্বিয়ার কাছে হেরে ব্রাজিল তৃতীয় হলেও, এদুয়ার্দোর পারফরম্যান্স ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা হাইলাইট।

সামনে এখন আরও বড় মঞ্চ। চলতি বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে কাতারে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের দিকে চোখ এই তরুণ তুর্কির। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তিনি লিখেছেন, দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ আমাদের মনের মতো শেষ হয়নি, তবে এই দলটির ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য এখন কাতার...
ব্রাজিলের হয়ে পেশাদার ফুটবলে এক মিনিটও মাঠে না নেমেই যেভাবে ইউরোপ কাঁপিয়ে দিচ্ছেন এদুয়ার্দো কনসেইসাও, তাতে ফুটবল মহলে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে, ব্রাজিলের সিনিয়র দলে অভিষেক হওয়ার আগেই কি ইউরোপের কোনো ক্লাব ১০০ মিলিয়ন ইউরো ঢেলে তাঁকে নিজেদের করে নেবে? উত্তর জানতে ফুটবল বিশ্বকে হয়তো বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না!
