গোপনে বন্ধুত্ব বাড়াচ্ছে তিন মার্কিন শত্রু!

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২৪, ০৮:৪৫ পিএম

কথায় আছে, শত্রুর শত্রু বন্ধু হয়! ইরান, রাশিয়া, চীনের শত্রু যুক্তরাষ্ট্র। শক্তিধর পশ্চিমা দেশটির কারণেই আজ ঐক্যবদ্ধ তিন দেশ। তাদের পররাষ্ট্রনীতিও অভিন্ন, বিশ্বমোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যহীন বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় তিন বন্ধু। নিজেদের অর্থনৈতিক বন্ধনের দৃঢ়তাই এই জোটের মূল ভিত্তি। পরিকল্পনামাফিক নতুন শক্তি গঠনে এখন আদা জল খেয়ে নেমে পড়েছে ইরান, রাশিয়া, চীন।

যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের এখন বন্ধুত্বের বিকল্প নেই। তাই কখনো গোপনে, কখনো প্রকাশ্যে চলছে তাদের ভাব-ভালোবাসা। ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি আর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে একটি মিল রয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের কালোতালিকায় জ্বলজ্বল করছে তাদের নাম। তাই তাঁদের ভ্রমণ-বিদেশি সফরও সীমিত। কিন্তু নিজেদের মধ্যে ভ্রমণ-যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন রাইসি, পুতিন এবং শি জিনপিং।

বাড়ছে পরস্পরের প্রতি ভালোলাগা-ভালোবাসা। সোমবার নির্বাচিত হওয়ার পর দ্রুতই পুতিনকে অভিনন্দন-শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছেন রাইসি। যদিও ইতিহাস বলছে, আগে রাশিয়া, ইরান এবং চীনের মধ্যে আজকের মতো বন্ধুত্ব ছিলোনা। ভেতরে ভেতরে সাম্রাজ্যবাদী তাঁরা। প্রায়ই এমন হতো যে পরস্পরের প্রতিবেশি দেশগুলোয় হস্তক্ষেপ করত তিনদেশ। পাশাপাশি বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ধাক্কাধাক্কিও হতো।

কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ-কর্মকাণ্ডে বদলে গেছে সব। দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ওবামা আমলে ইরানের সাথে পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিতকরণ নিয়ে চুক্তি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান ট্রাম্প। দুই বছর পর আবারও নিষেধাজ্ঞা দেন বাইডেন। চলতি বছরেও ইরানের ওপর একহাত নেন বাইডেন। হামাস-হুতিদের সমর্থনের জন্যে তেহরানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি সেই নিষেধাজ্ঞার গেরো আরও কঠোর হয়েছে। আর চীনের বিরুদ্ধেতো নিষেধাজ্ঞা লেগেই আছে। সামনে ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে নিষেধাজ্ঞা বলয় আরও জোরালো হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই প্রকাশ্যেই রাশিয়ার সঙ্গে সীমাহীন বন্ধুত্বের অঙ্গীকার করেছে চীন।

এখানেই শেষ নয়, ইরানের সঙ্গে ২৫ বছরে ৪০ হাজার কোটি ডলারের ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ ঘোষণা করেছে তারা। চীন-রাশিয়া ব্রিকসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এবার সদস্যপদ পেয়েছে ইরানও। পাশাপাশি তিন দেশের মধ্যেই ক্রমাগত বাণিজ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুল্কমুক্তভাবে পণ্য বাণিজ্যের জন্য ব্লক গঠনের পরিকল্পনা করছে তিন বন্ধু। সেই সঙ্গে অর্থ পরিশোধের নতুন ব্যবস্থা ও পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যপথ এড়িয়ে নতুন পথে বাণিজ্য করার পরিকল্পনাও আছে এই জোটের।

মার্কিনিদের কাছে এসব পরিকল্পনা দুঃস্বপ্নের মতো। এ রকম পশ্চিমবিরোধী অক্ষ গঠিত হলে তাদের শত্রুরা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সুযোগ পাবে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে এই দেশগুলো ঠিক কোথায় যাবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। চীন সব সময় রাশিয়া ও ইরানের পেট্রোলিয়াম পণ্যের ক্রেতা। তবে এই দেশ দুটি একই সঙ্গে ইউরোপ ও আমেরিকায় বিপুল পরিমাণে তেল বিক্রি করত, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইউরোপের সঙ্গে তেলের বাণিজ্যও ছিল চাঙা।

কিন্তু ইউরোপ-রাশিয়া ও ইরানের তেল নেওয়া বন্ধ করায় রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় ব্যারেল ব্যারেল তেল কিনছে চীন। যুদ্ধের আগে রাশিয়ার বন্দর দিয়ে দিনে এক লাখ ব্যারেল তেল কিনত চীন। এখন দিনে পাঁচ লাখ। ডিসেম্বরে রাশিয়া থেকে চীন দৈনিক ২২ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল নিয়েছে, যা চীনের মোট চাহিদার ১৯ শতাংশ। দুই বছর আগেও চীন রাশিয়া থেকে দিনে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ ব্যারেল তেল কিনত। একইসাথে গত বছরের শেষে ইরান থেকে দৈনিক গড়ে ১০ লাখ ব্যারেল তেল কিনেছে চীন, ২০২১ সালের তুলনায় যা ১৫০ শতাংশ বেশি।

কিন্তু নিষেধাজ্ঞার ভয়ে চীনের বড় বড় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল পরিশোধনাগারগুলো ইরানের তেল আমদানি করছে না, তবে তেল আমদানি করছে ছোট ছোট পরিশোধনাগারগুলো। যাদের দেশের বাইরে কোন অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে চীন রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় গ্যাসও পাচ্ছে। ২০২২ সালের ইউক্রেন অভিযান শুরু হওয়ার পর ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া’ হিসেবে পরিচিত পাইপলাইন দিয়ে রাশিয়ার গ্যাস আমদানি দ্বিগুণ করেছে চীন।

অন্যদিকে চীনের কাছে তেল-গ্যাস বিক্রি না করে তেমন কোন উপায়ও নেই ইরান-রাশিয়ার। চীনের ওপর পশ্চিমা প্রযুক্তি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার বাইরে নেই আর কোন বিধিনিষেধ। ফলে তারা সব দেশের কাছ থেকেই তেল কিনতে পারে, দর-কষাকষির সময় যা অনুকূলে পায় বেইজিং।

বিশ্ববাজারের প্রচলিত দামের তুলনায় রাশিয়া-ইরানের কাছ থেকে ব্যারেলপ্রতি ১৫ থেকে ৩০ ডলার কমে তেল কেনে চীন। এরপর সস্তা হাইড্রোকার্বন প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চ মূল্যের পণ্য তৈরি করে বেইজিং। অর্থাৎ তারা মূল্য সংযোজন করে। ২০১৯ সালের পর চীনের পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের যে বিকাশ ঘটেছে, তা বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সম্মিলিত দক্ষতা বৃদ্ধির তুলনায় বেশি।

রাশিয়ার কাছ থেকে চীনের যেমন তেল কেনা বেড়েছে, তেমনি মস্কোতে বেড়েছে চীনের রপ্তানি। করোনার সময় চীনের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে জুতা -টি-শার্ট রপ্তানির বদলে উচ্চ মূল্যের যন্ত্রপাতি রপ্তানিতে মনোযোগ দিয়েছে বেইজিং। এ ক্ষেত্রে রাশিয়া হলো তাদের পরীক্ষণ ভূমি বা বাজার। গত বছর চীনের গাড়ি রপ্তানিতে ইউরোপ নয়, শীর্ষ গন্তব্য ছিল রাশিয়া।

অন্যদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি বৃদ্ধি করেছে মস্কো। ইউক্রেন যুদ্ধের আগে দেশটি যত পেট্রলভিত্তিক গাড়ি আমদানি করত, গত বছর আমদানি করেছে তার তিন গুণ। তবে চীনের কাছ থেকে এখনো তেমন আমদানি করছে না ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করার সাহস এখনো করে উঠতে পারছে না চীনের বড় রপ্তানিকারকেরা। তাত্ত্বিকভাবে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়লে লাভ হবে ইরানের।

দুই দেশের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাণিজ্য আছে। যুদ্ধের জন্যে ২০২২ সাল থেকে রাশিয়াকে ড্রোন ও অস্ত্র সরবরাহ করছে ইরান। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম ইরান কোনো অমুসলিম দেশকে সামরিক সরঞ্জাম দিল তেহরান। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রথমবারের মতো রাশিয়াকে ট্যাংকারে করে ১০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করেছে ইরান।

শেষ কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের নীতির কারণে রাশিয়া, ইরান ও চীনের মধ্যে গভীর হচ্ছে সম্পর্ক। তবে নিজেদের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য করার মতো সময় এখনো আসেনি তাদের। তবে তিন দেশের সম্পর্ক যেদিকে যাচ্ছে, তাতে এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে হয়তো বেশি সময় লাগবেনা। আর এসব দেখে পশ্চিমাদের মনে কি প্রতিক্রিয়া হচ্ছে-তা জানতে চাওয়া হবে-কাটা গায়ে নুনের ছিটা দেয়ার মতো।

এআর
ইরানের ওপর মার্কিন বিমান হামলা জোরদার করার পাশাপাশি যুদ্ধের পরিধি আরও বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানকে নতি স্বীকার করাতে ওয়াশিংটনের এই সামরিক...
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে এক মাসের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি গত সপ্তাহে ভেস্তে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে, জর্ডানে...
আমেরিকার সাথে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কেন্দ্র করে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়েছে ইরান। দেশটির কট্টরপন্থীরা বর্তমান দৃশ্যমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক নীরব অভ্যুত্থান...
যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের একটি শপিং মলে সচারচরের একটি কর্মব্যস্ত দিন মুহূর্তেই যেন রূপ নিল এক বিভীষিকাময় রক্তাক্ত অধ্যায়ে। শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে উগ্র বর্ণবাদী ও চরমপন্থী এক শ্বেতাঙ্গ...
সিলেট বিভাগে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না হামের প্রাদুর্ভাব। গত চার মাসে বিভাগে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সবাই শিশু। যতো সময় যাচ্ছে, মৃত্যুর মিছিল ততোই...
নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে রাত ১টায় বিশ্বকাপ ফাইনালের মেগা মহারণে স্পেনের মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা, যেখানে নিজের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার লক্ষ্যে নামবেন লিওনেল মেসি। আর এই...
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীরা বিশ্বজুড়ে বড়ো ধরনের ভোগান্তিতে পড়েছেন। জনপ্রিয় এই মাধ্যম দুটিতে কম্পিউটার বা ডেস্কটপ সংস্করণ ব্যবহার করে লগইন বা প্রবেশ করা যাচ্ছে না। এর...
দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জের পর এবার উত্তরাঞ্চলের পাঁচটি জেলায় আকস্মিক বন্যার সতর্কতা জারি করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। একই সঙ্গে আগামী কয়েক...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর