সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রহস্যময় এক গোলকধাঁধার নাম। প্রেসিডেন্টের খাতায় নাম লেখার পর থেকে এখন পর্যন্ত কম কাঠখড় পোহাতে হয়নি তাকে। তবু যেন বিতর্ক ছাড়ছে না ট্রাম্পকে। যেমন তিনি হাস্যকর, ঠিক তেমনি আবার রগচটাও। নিজের মতো করে চলেন, জীবনটাকে নিজের মতো করেই সাজিয়ে নিয়েছেন। ঠিক যেন বাউণ্ডুলে এক মার্কিন তরুণের মতোই তার চরিত্র।
নীতি নৈতিকতা, ভালো-খারাপের বিবেচনাবোধ কখনোই ছিলো না আমেরিকান ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ব্যঙ্গ বিদ্রুপ সহ্য করা এই সাবেক প্রেসিডেন্টের।
দ্বিতীয় দফায় বাইডেনের কাছে হেরে এখন তৃতীয় দফায় প্রেসিডেন্টের সিংহাসনের জন্যে দৌড়ঝাঁপ ব্যস্ত তিনি। শ্বেতাঙ্গদের প্রিয় এই প্রার্থী প্রচারণার সাথে সাথে আদালতেও করছেন দৌড়ঝাঁপ। তার পেছনে আঠার মতো লেগে আছেন পর্ন তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলস।
মার্কিন মুলুকে বেশ পরিচিত এই পর্ন তারকার সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই সম্পর্ক যাতে ফাঁস না হয়ে যায়, তার জন্য পর্ন তারকাকে মোটা অঙ্কে ঘুষ দিয়েছিলেন। সেই তথ্য লুকিয়েছেন ট্রাম্প। পরে আদালতে যান ওই পর্ন তারকা। ট্রাম্পের সঙ্গে তার যৌন সম্পর্কের বিবরণ থেকে শুরু করে ঘুষের কথা জানান তিনি। ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করলো আদালত।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে করা মামলাটির অভিযোগে বলা হয়- ২০০৬ সালে স্টর্মি ড্যানিয়েলসের সঙ্গে তার যৌন সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। পরে ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে মুখ না খুলতে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে স্টর্মিকে ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার ঘুষ দেয়া হয়। তার হাতে এ অর্থ তুলে দিয়েছিলেন ট্রাম্পের আইনজীবী মাইকেল কোহেন। তবে ব্যবসায়িক নথিপত্রে এ লেনদেনের তথ্য গোপন করা
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেন আমেরিকার সাবেক কোন প্রেসিডেন্ট।
সম্পর্ক নিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে পর্ন তারকাকে ঘুষ দেয়ার অভিযোগের মামলায় বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করেন ম্যানহাটন আদালতের ১২ জুরি। মামলায় আনা ৩৪টি অভিযোগের সব কটিতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন ট্রাম্প। আগামী ১১ জুলাই সাজা ঘোষণার পরই শুরু হবে আসল খেলা।

ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত কোন প্রার্থী কি পারবেন মার্কিন নির্বাচনের মতো নির্বাচনে লড়তে? কী বলা হয়েছে দেশের সংবিধানে? সত্যি কথা বলতে, ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ডধারী কাউকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে দেয়া যাবে না, এমন কোনো শর্ত লেখা নেই দেশের সংবিধানে। সে কারণে এবারও পার পেয়ে যেতে পারেন সাবেক প্রেসিডেন্ট। দ্রুত আপিলের সিদ্ধান্তও নিয়েছেন ট্রাম্প।
কিন্তু ১১ জুলাইয়ের সাজায় কী অপেক্ষা করছে ট্রাম্পের জন্যে? এই অপরাধের সাজা হিসেবে ট্রাম্পের জেল সাজা হতে পারে। আবার বিশাল অঙ্কের জরিমানাও হতে পারে। সাজার পরিবর্তে ট্রাম্পকে সমাজকর্মেও পাঠাতে পারে আদালত।
দেশটির আইনজ্ঞরা বলছেন, সম্ভবত বয়স ও মর্যাদা বিবেচনায় ট্রাম্পকে জেলে পাঠাবেন না বিচারক। তাই এখনই ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।
চলতি বছরের শুরুর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থীর মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন ট্রাম্প। তার সাজা ঘোষণার কয়েক দিন পরই রিপাবলিকানদের জাতীয় সম্মেলন। যেখানে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করার কথা রয়েছে। বিভিন্ন জরিপের ইঙ্গিত, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেমোক্রেটিক পার্টির জো বাইডেনের সঙ্গে ট্রাম্পের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।
নির্বাচনের ফলাফল ঠিক করে দেবে, এমন গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন ট্রাম্প। কিন্তু এই জরিপগুলোতে এই বিষয়টিও আছে যে, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর বদলে যেতে পারে সব হিসেব-নিকেষ।
বুথ ফেরত জরিপেও বহু ভোটার বলেন, ট্রাম্প যদি দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে তারা তাকে ভোট দেবেন না। ফৌজদারি অপরাধে সাজা পাওয়া ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে চান না তারা।

এপ্রিলে ইপসোস ও এবিসি নিউজের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ট্রাম্পকে সমর্থনকারী ভোটারদের মধ্যে ১৬ শতাংশ এমন পরিস্থিতিতে তাদের সমর্থন পুনর্বিবেচনা করবেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এই জরিপ অনুমান নির্ভর। কারণ, তখন তো মামলায় রায়ই হয়নি। কিন্তু এখন রায় হয়ে গেছে। ফলে এখন সত্যিকার অর্থেই ট্রাম্পের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আলোকেই ভোট নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারবেন ভোটাররা।
তবে কঠিন সময়ে ট্রাম্পের পাশে তার দল রিপাবলিকান শিবির। আসছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে তাকে লাখ লাখ ডলারের সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে রিপাবলিকান কর্তাব্যক্তিরা। যদিও ট্রাম্পের নির্বাচনী ভবিষ্যত জানা জাবে ১১ জুলাইয়ের দিনে। নির্বাচনের পাঁচ মাস আগেই চরম অস্বস্তিতে পড়লেন ট্রাম্প। যদিও আদালত থেকে বেরিয়েই যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প।

বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ট্রাম্প নিজেকে একজন ‘রাজনৈতিক বন্দি’ হিসেবে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমি এইমাত্র একটি তথ্য কারচুপির মামলায় রাজনৈতিক বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়েছি, আমি কোনো ভুল করিনি। তারা আমার বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে, আমাকে গ্রেপ্তার করেছে, এখন তারা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। এটা আমার জন্য মানহানিকর। আমি ন্যায়বিচার পাইনি। আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে যাব।
ভারতের সিকিম সীমান্তে চীনের যুদ্ধবিমান মোতায়েন