ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য দীর্ঘপাল্লার সামরিক ড্রোনের বিকাশ ও উৎপাদনের লক্ষ্যে চীনে রাশিয়ার একটি গোপন অস্ত্র কর্মসূচি রয়েছে বলে একটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার দুই সূত্র ও ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পর্যালোচনা করা নথিতে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানার অস্ত্র কোম্পানি আলমাজ-আন্তে’র একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইইএমজেড কুপোল স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় চীনে গার্পিয়া-৩ (জি৩) নামে একটি নতুন যুদ্ধ ড্রোনের মডেল তৈরি করেছে এবং এর পরীক্ষামূলক ফ্লাইটও সম্পন্ন করেছে।
চলতি বছরের শুরুতে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ কাজের একটি রূপরেখা পাঠায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা কুপোল। ওই নথিতে এ তথ্য জানতে পারে ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও রয়টার্স।
কুপোলের পাঠানো পরবর্তী আপডেটে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়, ইউক্রেনের ‘বিশেষ সামরিক অভিযানে’ মোতায়েন করতে চীনের একটি কারখানায় জি৩-সহ আরও ড্রোন তৈরি করতে সক্ষমতা অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ‘বিশেষ সামরিক অভিযানে’ শব্দটি ইউক্রেনের সাথে চলমান যুদ্ধের জন্য ব্যবহার করে মস্কো।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য কুপোল, আলমাজ-আন্তে এবং রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করলেও তাদের দিক থেকে তাৎক্ষণিক কোনও সাড়া পায়নি রয়টার্স।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে কুপোলের পাঠানো প্রতিবেদন অনুসারে, ৫০ কেজির পেলোড নিয়ে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করতে পারে জি৩। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আরও কিছু পরীক্ষার জন্য জি৩ ও চীনে তৈরি অন্যান্য ড্রোন মডেলের কিছু নমুনা রাশিয়ায় পাঠিয়েছে কুপোল।
নথিগুলোতে এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত চীনা ড্রোন বিশেষজ্ঞ, যারা এর রূপরেখা দিয়েছে, তাদের পরিচয় প্রকাশ করেনি এবং রয়টার্সও তাদের পরিচয় নির্ধারণ করতে পারেনি।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা দুইটি পৃথক নথি (যেগুলো আসলে চালানপত্র ছিল) অনুসারে, কুপোল রাশিয়ার ইজেভস্ক শহরের সদর দপ্তরে দুইটি জি৩-সহ চীনে তৈরি সাতটি সামরিক ড্রোন সরবরাহ করেছে। গ্রীষ্মে সেগুলোর চালান দেয় একটি রুশ সংস্থা।
দুইটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছ, সংস্থাটি চীনা সরবরাহকারীদের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। চালানগুলোর একটিতে চাইনিজ মুদ্রা ইউয়ানে অর্থ প্রদানের অনুরোধ করা হয়। তবে সেটিতে ডেলিভারির নির্দিষ্ট কোনও তারিখ বা চীনে সরবরাহকারীদের ঠিকানা উল্লেখ ছিল না।

গোয়েন্দা সূত্র দুইটি জানিয়েছে, কুপোলে নমুনা ড্রোনের এ সরবরাহ, সংস্থাটি যে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চীনে তৈরি পুরো ইউএভি রাশিয়াকে সরবরাহ করছে, তার প্রথম দৃঢ় প্রমাণ।
দুইটি সূত্রই তথ্যের সংবেদনশীলতার কারণে তারা তাদের সংস্থার নাম ও পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে বলেছে, এ ধরনের কোনও প্রকল্প সম্পর্কে অবগত নয় বেইজিং। দেশটি ড্রোন বা মনুষ্যবিহীন এরিয়াল ভেহিকল (ইউএভি) রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা।
লন্ডনভিত্তিক প্রতিরক্ষা থিংক-ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক ফ্যাবিয়ান হিনজ বলেছেন, চীন থেকে রাশিয়ায় ইউএভি সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত হলে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।
রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত চীন যা সরবরাহ করেছে, আপনি যদি খেয়াল করেন, দেখবেন, সেসবের সরঞ্জামের অধিকাংশই ছিল দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য, যেগুলো অস্ত্র ব্যবস্থায় ব্যবহার করা যেতে পারে আবার অন্য ব্যবহারও রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এমন তথ্যই রিপোর্ট করা হয়েছে। তবে অন্তত উন্মুক্ত উৎসে, আমরা যা সত্যিই দেখিনি তা হলো, পুরো অস্ত্র ব্যবস্থার নথিভুক্ত সরবরাহ।’

ওয়াশিংটন ভিত্তিক একটি থিংক-ট্যাংক সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির এক সহকারী সিনিয়র কর্মকর্তা স্যামুয়েল বেন্ডেট মনে করছেন, মস্কোর যুদ্ধমেশিনকে সাহায্য করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করার আগে দুইবার ভাববে বেইজিং। চীন রুশ সামরিক ড্রোন উৎপাদনে আয়োজক ভূমিকা পালন করছে, এমন দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য আরও তথ্যের প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
হোয়াইট হাউজের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল বলেছে, ড্রোন প্রোগ্রাম বিষয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদন নিয়ে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি রুশ কোম্পানিকে চীনা কোম্পানি প্রাণঘাতী অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা প্রদান করার একটি উদাহরণ এটি।
হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্র জানান, চীনা সরকার এই লেনদেন সম্পর্কে সচেতন, এমন দাবি করার মতো কোনকিছু দেখেনি তারা। তবে চীনা কোম্পানিগুলো সামরিক বাহিনীর জন্য রাশিয়াকে যে প্রাণঘাতী সহায়তা প্রদান করছে না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব চীনের রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে ন্যাটোর মুখপাত্র মুখপাত্র ফারাহ দাখলাল্লাহ ইমেইলে জানান, ‘এই প্রতিবেদনগুলো গভীরভাবে উদ্বেগজনক এবং মিত্ররা এ বিষয়ে পরামর্শ করছে। নিজ স্বার্থ ও খ্যাতিকে প্রভাবিত না করে চীন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংঘাতের আগুনে ঘি ঢেলে যেতে পারে না।’
এদিকে, চীনকে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় কূটনৈতিক ও বস্তুগত সহায়তা প্রদান বন্ধের আহ্বান জানিয়ে ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘রাশিয়া চীনে সামরিক ড্রোন তৈরি করছে এমন প্রতিবেদনে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। এমনটি হলে তা অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে চীনের দেওয়া বিবৃতির সঙ্গে সরাসরি দ্বান্দ্বিক হবে।’
মার্কিন নির্বাচনের আগে পারমাণবিক পরীক্ষা চালাতে পারে উত্তর কোরিয়া