২০২০ সালের পর প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিতে এসে জাতিসংঘকেই একহাত নিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু তাই নয়, সীমান্ত ও জলবায়ু ইস্যু নিয়ে চলমান বিশ্ব ধারণাকেও সেকেলে বলে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে হামাসকে ‘পুরস্কৃত’ করা বলেও মন্তব্য করেছেন আমেরিকান নেতা। খবর- বিবিসি, রয়টার্স ও আল জাজিরা।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য দেয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বন্ধ করার দায়িত্ব জাতিসংঘের হলেও এই কাজটি তাকেই করতে হচ্ছে। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর সাতটি যুদ্ধ বন্ধ করেছি। এই কাজের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপ্য। তবে তিনি আরও বলেন, নোবেলের চেয়েও বড় পুরস্কার হলো লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারা।
তিনি সংস্থাটিকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ এনে এবং অবৈধ অভিবাসন উৎসাহিত করার দাবি তুলে আক্রমণ করেন। জাতিসংঘ অভিবাসনের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর এক ধরনের ‘আক্রমণ’ বাড়িয়ে তুলছে, যেসব দেশ তার ভাষায় ‘নরকে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশ্ন তোলেন, জাতিসংঘের উদ্দেশ্যই বা কী? তিনি বলেন, তাদের যা করতে দেখা যায় তা হলো খুব জোরালো ভাষায় একটি চিঠি লেখা। এগুলো ফাঁকা বুলি, আর ফাঁকা বুলি দিয়ে যুদ্ধ থামে না। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ভাঙা এসকেলেটর ও টেলিপ্রম্পটার নিয়েও হাস্যরস করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২০ সালের পর এই প্রথম নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছেন। সাবেক মার্কিন প্রশাসনের সমালোচনা করেই বক্তব্য শুরু করেন ট্রাম্প। তিনি তার পূর্বসূরিকে দায়ী করেন একের পর এক ‘বিপর্যয়ের’ জন্য। দ্বিতীয় মেয়াদের আট মাস পার করে যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত দেশ’ বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। এটি নিঃসন্দেহে আমেরিকার স্বর্ণযুগ,” বলেন তিনি।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের পণ্যে উচ্চহারে শুল্কারোপের পর ‘ঐতিহাসিব সব বাণিজ্য চুক্তি’ করার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্বর্ণযুগ পার করছে। বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে প্রথমেই ট্রাম্প উল্লেখ করেন যুক্তরাজ্যের কথা। ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করা প্রথম দেশ যুক্তরাজ্য। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো-সহ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং আরও অনেক অনেক দেশ এই কাতারে আছে বলে জানান ট্রাম্প।
শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থাটি নয়, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে শত্রু-মিত্র সবাইকেই নানাভাবে কথা শুনিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি ওয়াশিংটনের বেশ কিছু মিত্র দেশের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়াকে ‘ভয়াবহ নৃশংসতার জন্য হামাসকে পুরস্কার’ হিসাবে উল্লেখ করেন এবং শান্তির জন্য জিম্মিদের মুক্তি দিতে গোষ্ঠীটিকে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমাদের অবিলম্বে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। আমাদের এটি থামাতেই হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে ধাপ্পাবাজি হিসেবেও অভিহিত করে ট্রাম্প বলেন, আমার মতে, বিশ্বের মধ্যে হওয়া সবচেয়ে বড় প্রতারণামূলক কাজ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। কার্বণ নৃঃসরণ হলো ভুয়া (কথা)। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ‘জোক’ বা ‘কৌতুক’ হিসেবে অভিহিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এই নবায়নযোগ্য জ্বালানি অনেক ব্যয়বহুল এবং অকার্যকর বলেও দাবি করেন তিনি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে সবুজায়ন ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এটিরও তীব্র সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যদি আপনার দেশ এই সবুজ ধাপ্পাবাজি থেকে বের না হয়। তাহলে আপনারা ব্যর্থ হবেন। ট্রাম্প বিশ্ব উষ্ণায়ন কমানোর প্রচেষ্টার নিন্দা করেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের উদ্বেগকে বিশ্বের উপর চাপানো সবচেয়ে বড় প্রতারণা বলে অভিহিত করেন।

রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ভারত ও চীনের বিরুদ্ধে আক্রমণ অব্যাহত রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ভাষণে নয়াদিল্লি ও বেইজিংকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থায়নের জন্য অভিযুক্ত করেন। তিনি রাশিয়াকে সতর্ক করে বলেছেন, যদি তারা যুদ্ধ শেষ করার জন্য আলোচনায় না আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র মস্কোর উপর খুব শক্তিশালী শুল্ক আরোপ করবে। কিছু ন্যাটো দেশ রাশিয়ার শক্তি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
তিনি বলেন, এক বছর আগে, আমাদের দেশ গভীর সংকটে ছিল। কিন্তু আজ আমরা সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। আমেরিকা সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি, সীমান্ত, সামরিক বাহিনী, বন্ধুত্ব এবং চেতনায় আশীর্বাদপ্রাপ্ত। আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কর কর্তন চালু করেছে, যখন শেয়ার বাজার শক্তিশালীভাবে কর্মক্ষম ছিল এবং মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। গত চার মাস ধরে, এদেশে অবৈধ অভিবাসী প্রবেশের সংখ্যা শূন্য। আমাদের বার্তা খুবই সহজ, আপনি যদি অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন, তাহলে আপনাকে জেলে যেতে হবে।
