হংকংয়ের তাই পো এলাকার ওয়াং ফুক কোর্ট আবাসিক কমপ্লেক্সে সংঘটিত ভয়াবহ আগুনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫ হয়েছে এবং ৭০ জনেরও বেশি বাসিন্দা আহত হয়েছেন। গত কয়েক দশকে হংকংয়ে এটি অন্যতম প্রাণঘাতী আগুন দুর্ঘটনা। তদন্ত যত গভীরে যাচ্ছে, আগুন এতটা ভয়াবহ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে ভবনগুলোতে ব্যবহৃত নির্মাণ সামগ্রীর ভূমিকা ততটাই সন্দেহের কেন্দ্রে আসছে।
এই ঘটনায় সন্দেহজনক নরহত্যার অভিযোগে টাওয়ার কমপ্লেক্সটির সংস্কার কাজের দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থার তিন শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমন একটি টাওয়ারের প্রতিটি তলার জানালার সঙ্গে অত্যন্ত দাহ্য স্টাইরোফোম সংযুক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এতে অনুমান করা হচ্ছে, এই উপাদানটি সংস্কার কাজের সময় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

স্টাইরোফোম: দ্রুত আগুন ছড়ানোর মূল কারণ?
স্টাইরোফোম হলো পলিস্টাইরিন নামক পেট্রোলিয়াম প্লাস্টিক থেকে তৈরি একটি উপাদান। নির্মাণ, ইন্সুলেশন (তাপ নিরোধক) এবং খাদ্য প্যাকেজিংয়ে এটি বহুল ব্যবহৃত।
স্টাইরোফোমের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি অপেক্ষাকৃত কম তাপমাত্রাতেই জ্বলে উঠতে পারে এবং অত্যন্ত দ্রুত দগ্ধ হয়। পোড়ার সময় এটি ঘন কালো ধোঁয়া ও কার্বন মনোক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন করে। স্টাইরোফোমের গঠনের প্রায় ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশই হলো বায়ুপূর্ণ পকেট। উপাদানটি হালকা এবং ভাসমান হলেও এর গঠন বৈশিষ্ট্যই আগুনের শিখাকে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
সন্দেহের তালিকায় সংস্কারের সামগ্রী
হংকংয়ের সংবাদমাধ্যম দ্য স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠিকাদার সংস্থা প্রেষ্টিজ কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড গত বছর ভবন মালিকদের উদ্দেশ্যে একটি নোটিশ জারি করেছিল। সেই নোটিশে সংস্কারের সময় ব্যবহৃত সামগ্রীর উল্লেখ ছিল।

নোটিশে বলা হয়েছিল, নির্মাণের সময় বালি বা পাথরের টুকরোগুলো যাতে কাঁচের ক্ষতি না করতে পারে, সেজন্য জানালাগুলো ঢাকতে ‘ফোম বোর্ড’ ব্যবহার করা হবে। এছাড়া দাহ্য ক্যানভাস এবং কাঠের প্যানেল ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছিল। এসব দাহ্য সামগ্রীর ব্যবহারই এখন কর্তৃপক্ষের প্রধান তদন্তের বিষয়।
'মারাত্মক অবহেলা'র অভিযোগে গ্রেপ্তার
সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা এইলিন চুং এপি-কে জানিয়েছেন, তাদের বিশ্বাস, নির্মাণ সংস্থার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা ‘মারাত্মকভাবে অবহেলা’ করেছেন, যার ফলে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
নিরাপত্তা সচিব ক্রিস ট্যাং উল্লেখ করেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা লক্ষ্য করেছেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের বাইরের দিকে ব্যবহৃত প্রতিরক্ষামূলক জাল, ফিল্ম, পানিরোধী ক্যানভাস এবং প্লাস্টিকের শিটগুলো সাধারণ মানসম্মত উপাদানের চেয়েও দ্রুত এবং তীব্রভাবে জ্বলেছে।
এই 'অস্বাভাবিক' পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিস একটি যৌথ টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে। টাস্ক ফোর্স নিশ্চিত করবে, ব্যবহৃত নির্মাণ সামগ্রীগুলো আগুন ও বিল্ডিং স্ট্যান্ডার্ড মেনে তৈরি হয়েছিল কি না, এবং সেই অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক অ্যান্ডি ইয়ুং আরও জানান, অক্ষত ভবনেও ভেন্টিলেশন জানালাগুলো ফোম বোর্ড দিয়ে সিল করা অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা দ্রুত আগুন ছড়ানোর কারণ হতে পারে।
মর্মান্তিক দৃশ্য এবং জনৈক বাসিন্দার আর্তি
১৯৮০-র দশকে নির্মিত এই বিশাল আবাসিক কমপ্লেক্সটি আটটি বিল্ডিং নিয়ে গঠিত এবং এতে প্রায় দুই হাজার অ্যাপার্টমেন্টে চার হাজার ৮০০ জন বাসিন্দা বাস করতেন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন বয়স্ক।
ঘটনার সময়কার বর্ণনা দিতে গিয়ে লরেন্স লী নামের এক বাসিন্দা এপি-কে বলেন, যখন আগুন লাগে, আমি ফোনে তাকে (স্ত্রী) পালাতে বলি। কিন্তু সে যখন ফ্ল্যাট থেকে বের হয়, করিডোর এবং সিঁড়ি তখন ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিলো এবং সব অন্ধকার, তাই বাধ্য হয়ে তাকে ফ্ল্যাটে ফিরে যেতে হয়।
এটি হংকংয়ে গত কয়েক দশকের মধ্যে দেখা অন্যতম ভয়াবহ আগুনের ঘটনা। এর আগে ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে একটি বাণিজ্যিক ভবনে প্রায় ২০ ঘণ্টা ধরে আগুন চলার ফলে ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
হংকংয়ের বহুতল ভবনে আগুনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫