শোকের উপলক্ষ্য অনুযায়ী কালো পোশাক পরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশের প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন; তাদের দুজনের মুখেই ছিল শোকের ছায়া।
৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন এবং পরের দিন রাজধানী ঢাকায় তার জানাজায় যোগ দিতে আসা আঞ্চলিক নেতাদের মধ্যে জয়শঙ্কর ছিলেন অন্যতম।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) হাল ধরা তারেক রহমানের হাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি চিঠি তুলে দেন জয়শঙ্কর। এরপর সামাজিক মাধ্যম এক্সে বৈঠকের ছবিসহ এক পোস্টে জয়শঙ্কর এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেন যা বিএনপির সঙ্গে নয়াদিল্লির অতীত সম্পর্কের তুলনায় এক নাটকীয় পরিবর্তন নির্দেশ করে।

তিনি লেখেন, ভারত সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানিয়েছি। আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেছি যে, বেগম খালেদা জিয়ার স্বপ্ন ও আদর্শ আমাদের অংশীদারিত্বের উন্নয়নে পথ দেখাবে।
কয়েক দশক ধরে ভারত প্রকাশ্যে বা গোপনে খালেদা জিয়ার ‘স্বপ্ন ও আদর্শের’ বিরোধিতা করে আসছিল। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ সমর্থকের কাছে তিনি ১৯৮০-র দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ১৯৯১ সালে প্রথম ক্ষমতায় এলেও ভারত তাকে সর্বদা সন্দেহ ও অবিশ্বাসের চোখে দেখেছে। কয়েক দশক ধরে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির জোট ছিল, যারা ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষপাতী।
অন্যদিকে, ভারত খালেদা জিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা এবং তার ধর্মনিরপেক্ষ দল আওয়ামী লীগকে তাদের স্বাভাবিক মিত্র হিসেবে বিবেচনা করত।
কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে জয়শঙ্করের মন্তব্য এটাই স্পষ্ট করছে যে, ভারত এবং বিএনপি তাদের দীর্ঘদিনের তিক্ততা ভুলে একটি ঘনিষ্ঠ কর্মসম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে।

তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আল জাজিরাকে বলেন, ঢাকায় তারেক রহমান ও তার ঘনিষ্ঠ দলের সঙ্গে জয়শঙ্করের ‘অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ’ বৈঠকটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি নতুন পর্যায়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি ভারত ও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি উভয় পক্ষকেই এই পরিবর্তনের পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের পতনের পর, ক্ষমতাচ্যুত নেত্রীর প্রতি নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের সমর্থন বাংলাদেশের মানুষের মনে কড়া ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি করেছে।
হাসিনা বর্তমানে নয়াদিল্লিতে নির্বাসনে রয়েছেন এবং গত বছর বিক্ষোভকারীদের ওপর নৃশংস দমন-পীড়নের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও ভারত তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে অস্বীকার করেছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সেই দমন-পীড়নে প্রায় ১,৪০০ মানুষ মারা গেছে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি অব্যাহত রয়েছে। চব্বিশের আন্দোলনের একজন কট্টর ভারতবিরোধী নেতার হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে আবারও ভারতবিরোধী বিক্ষোভ দানা বাঁধে। অন্যদিকে, এক হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাংলাদেশি গণপিটুনির শিকার হন। এনিয়ে ভারতেও উত্তেজনা ছড়ায়। উভয় দেশকেই সাময়িকভাবে তাদের হাইকমিশনে ভিসা পরিষেবা বন্ধ করতে হয়েছিল।

তবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে হাসিনার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, আওয়ামী লীগের ফেলে আসা উদার ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক স্থানটি দখল করার চেষ্টা করছে বিএনপি। দলটি জামায়াতের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করেছে- যে জামায়াত এখন চব্বিশের ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের গঠিত দলের সঙ্গে একটি শক্তিশালী জোট গঠন করেছে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পরবর্তী সরকার গঠনের দৌড়ে বিএনপি এবং জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটকেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারত জামায়াতের রাজনীতি এবং তাদের পাকিস্তানঘেঁষা অবস্থানের সঙ্গে আপস করতে না পারলেও তারেক রহমান ইদানীং এমন কিছু বক্তব্য দিচ্ছেন, যা নয়াদিল্লির জন্য স্বস্তিদায়ক।
১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে ডিসেম্বরের শেষের দিকে ঢাকায় ফিরে তারেক রহমান সমর্থকদের বলেন, তিনি এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ চান যেখানে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ থাকবে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা আল জাজিরাকে বলেন, তারেক রহমানের কথা শুনে মনে হয় তিনি ‘নির্বাসনের বছরগুলোতে পরিণত হয়েছেন’।
তারেক রহমানের মতো বিএনপি নিজেও ২০০৬ সালে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে কার্যত রাজনৈতিক নির্বাসনে ছিল। প্রথমে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পরে হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার দলটির নেতাদের একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে কোণঠাসা করে রাখে।
বিএনপি যখন শেষবার ক্ষমতায় ছিল (২০০১-২০০৬), তার সিংহভাগ সময় জুড়েই ভারতে মোদীর দল বিজেপি ক্ষমতায় ছিল (১৯৯৮-২০০৪)। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। সেই আমলে বাণিজ্য বিরোধ, সীমান্ত সমস্যা, নদীবন্টন, অভিবাসন, সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য ছিল।
নয়াদিল্লি অভিযোগ করেছিল, বাংলাদেশ তাদের ভূখণ্ডে ভারতবিরোধী সশস্ত্র যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। ভারত আরও অভিযোগ করেছিল, বিএনপি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আঁতাত করছে। তবে ঢাকা বরাবরের মতোই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
শ্রিংলা বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই এই সম্পর্কের প্রেক্ষাপট ছিল পারস্পরিক অবিশ্বাস ও শত্রুতার। বিএনপি সরকারের আমলে বাংলাদেশ একটি ভারতবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল এবং পাকিস্তানের খুব ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। আর সেই সরকারে তারেক রহমান ছিলেন একজন প্রধান চালিকাশক্তি।
তবে এখন হিসাব-নিকাশ বদলে গেছে। নভেম্বরের শেষের দিকে খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে মোদী দ্রুত তার আরোগ্য কামনা করেন। বিএনপিও সেই বার্তার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানায়।
শ্রিংলা মনে করেন, তারেক রহমান বুঝতে পেরেছেন যে, একজন সফল প্রধানমন্ত্রী হতে হলে তার ভারতের সমর্থন প্রয়োজন, অথবা অন্ততপক্ষে ভারতের বিরোধিতা তিনি চান না।

জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে তারেক রহমান এখন সব সঠিক কথাই বলছেন। লন্ডন থেকে ফেরার পর ঢাকার রাস্তায় তাকে স্বাগত জানাতে যেভাবে লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল, তাতে বোঝা যায় তিনি এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট বা অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির তুলনায় তারেক রহমানই এখন নয়াদিল্লির জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ব্যক্তিত্ব। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ বলেন, ভারত ছাত্র বিপ্লবী এবং জামায়াতে ইসলামীকে তাদের স্বার্থের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখে।
সাউথ এশিয়া রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির বিচ্ছেদ নয়াদিল্লিকে রহমানের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। তবে তিনি এও বলেন যে, ভারত সানন্দে নয় বরং প্রয়োজনের তাগিদেই রহমানের দিকে হাত বাড়াচ্ছে।
তবে শুধু ছবি তোলা বা করমর্দনই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মেরামতের জন্য যথেষ্ট নয়। তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নতুন শুরুর জন্য ‘অতীতের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ’ প্রয়োজন।
হাসিনার আমলে ঢাকাকে নয়াদিল্লির প্রতি অত্যন্ত অনুগত দেখা যেত বলে মন্তব্য করেন কবির। তিনি বলেন, তারেক রহমান ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তির কাছ থেকে সমান দূরত্ব বজায় রাখবে এবং ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করবে।
কবির আরও জানান, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত হলে তারেক রহমানের সরকার হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে। তিনি বলেন, হাসিনাকে সেখানে আশ্রয় দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায় এখন নয়াদিল্লির ওপর।
রাজনীতি ও কূটনীতির বাইরেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অস্থিরতা দেখা গেছে। শনিবার বিজেপির নেতাদের আপত্তির মুখে কেকেআর ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে বাংলাদেশি বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দিতে বলেছে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়াতে মনে করেন, তারেক রহমান ক্ষমতায় ফিরলে ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশে পাকিস্তান বা ভারতবিরোধী জঙ্গি গোষ্ঠীদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে রাখা। তবে বিএনপির উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের মতে, তারেক রহমানের মূল লক্ষ্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের যে সম্পর্ক হাসিনার আমলে তলানিতে ঠেকেছিল, তা পুনরুজ্জীবিত করা।
সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হবে: ইসি সানাউল্লাহ
ওবায়দুল কাদেরসহ ১৪ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
গভীর সমুদ্রে গবেষণা ও সমস্যা চিহ্নিতকরণের ওপর প্রধান উপদেষ্টার গুরুত্বারোপ