আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যা সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি গুরুতর। সূত্রমতে, এটি ভেনেজুয়েলার মতো কোনো সংক্ষিপ্ত বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান হবে না; বরং এটি হতে পারে কয়েক সপ্তাহব্যাপী এক বিশাল সামরিক অভিযান। দ্রুত গতি, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু, নিখুঁত নিশানা আর নিরাপদ প্রস্থানে সর্বশক্তি নিয়োগ করছে পেন্টাগন।
প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী অ্যাক্সিওস সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ। তিনি বলেন, ট্রাম্প) ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন। তাঁর চারপাশের কেউ কেউ তাঁকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে সতর্ক করলেও, আমার মনে হয় আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একটি প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত দেখতে যাচ্ছি।

এই অভিযানটি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের একটি যৌথ কর্মসূচি, যা গত জুনের ১২ দিনব্যাপী হামলার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত হবে এবং সরাসরি ইরানের নেতৃত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এই যুদ্ধ ট্রাম্পের বর্তমান প্রেসিডেন্সির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এত বড় একটি ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, এ বিষয়ে কংগ্রেসের সাথে খুব সামান্যই আলোচনা করা হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনার জেরে ট্রাম্প প্রায় হামলার নির্দেশ দিয়েই ফেলেছিলেন। তখন সরাসরি হামলা না হলেও, ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করে, একদিকে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা এবং অন্যদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখা। এর মাধ্যমে ট্রাম্প তেহরানকে দেখাতে চেয়েছেন, চুক্তিতে না পৌঁছালে যুদ্ধের রূপ কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
গত মঙ্গলবার জেনেভায় ট্রাম্পের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সাথে তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন। উভয় পক্ষ অগ্রগতির কথা বললেও, অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যকার মতপার্থক্য এখনো অনেক বিশাল এবং মার্কিন কর্মকর্তারা এই আলোচনা নিয়ে খুব একটা আশাবাদী নন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে বলেছেন, ট্রাম্প কিছু 'রেড লাইন' বা চূড়ান্ত সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা ইরান সমাধান করতে আগ্রহী নয়।

ইরানের চারপাশে মার্কিন সামরিক শক্তির মহড়া
তেহরান দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় ফেরার প্রতিশ্রুতি দিলেও, যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে তাদের বিমান ও নৌ শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এফ-৩৫, এফ-২২ এবং এফ-১৬ সহ ৫০টিরও বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান পশ্চিম এশিয়ায় পৌঁছেছে।
জানুয়ারির শেষে 'ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন' রণতরিকে আরব সাগরে পাঠানো হয়েছিল। এরপর ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে এক ডজন এফ-১৫ ফাইটার জেট, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং এ-১০সি থান্ডারবোল্ট গ্রাউন্ড অ্যাটাক এয়ারক্রাফট মোতায়েন করা হয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার 'ইউএসএস ডেলবার্ট ডি ব্ল্যাক' সুয়েজ খাল দিয়ে লোহিত সাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এছাড়া পারস্য উপসাগরের আকাশে এমকিউ-৪সি ট্রাইটন নজরদারি ড্রোন এবং ই-১১এ কমিউনিকেশন এয়ারক্রাফট সক্রিয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে তাদের দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরিও পাঠিয়ে দিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানকে দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি বিস্তারিত প্রস্তাব জমা দিতে হবে। উল্লেখ্য যে, গত বছরের জুনেও ট্রাম্প আলোচনার জন্য দুই সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন, কিন্তু তার মাত্র তিন দিন পরেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছিল। ইসরাইলি কর্মকর্তাদের মতে, তাদের সরকারও কয়েক দিনের মধ্যে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
