একটি বিষয়ে কোন সংশয় নেই যে, ক্যান্সার প্রাণঘাতী রোগ। এই তো দু’বছর আগেই, ২০২৩ সালে এক কোটির বেশি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ ও অর্থায়ন না করলে ২০৫০ সাল নাগাদ ক্যান্সারে তিন কোটিরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হবে আর মৃত্যু বরণ করবে প্রায় দুই কোটি মানুষ। বিগত শতাব্দীতে মানুষের মৃত্যূর প্রধান কারণ ছিলো সংক্রামক রোগ, শতাব্দী পেরিয়ে সেই জায়গা দখল করেছে অসংক্রামক রোগ যার অন্যতম ক্যান্সার।
বিভিন্ন অঙ্গের ক্যান্সারের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে ফুসফুসের ক্যান্সার। নারী-পুরুষ মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয় এবং মৃত্যূবরণ করে ফুসফুসের ক্যান্সারে। পৃথিবীব্যাপী এবং বাংলাদেশের চিত্র একই।
ক্যান্সারে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ফুসফুসের ক্যান্সারের শীর্ষে অবস্থানের অন্যতম কারণ রোগ দেরিতে সনাক্ত হওয়া। যে অবস্থায় রোগ সনাক্ত হলেও চিকিৎসা পেলে নিরাময় সম্ভব, তা পার হয়ে যায়। ক্যান্সার রোগের এই অবস্থাকে বলা হয় রোগের অগ্রসর পর্যায় (Advanced Stage)। ফুসফুসের ক্যান্সারে সনাক্ত রোগির অর্ধেকের বেশিই এই পর্যায়ের রোগি। অথচ যথাসময়ে অর্থাৎ দ্রুত রোগ নির্ণয় করতে পারলে এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে ফুসফুস ক্যান্সার থেকে নিরাময় সম্ভব।
ফুসফুসের ক্যান্সার দেরিতে সনাক্ত হওয়ার একটি বড় কারণ রোগের লক্ষণ দেরিতে প্রকাশ পাওয়া এবং লক্ষণসমূহকে সাধারণ লক্ষণ হিসাবে অবহেলা করা। ফুসফুসের ক্যান্সারের অন্যতম উপসর্গ কাশি। নানান কারণে বছরের কোন না কোন সময়ে আমাদের অনেকেরই কাশি হয়; আবার তা সেরেও যায়।
বিশেষত বায়ুদূষণ, বাৎসরিক আবহাওয়া পরিবর্তনের কালে, তাপমাত্রার তারতম্য, ফ্লু সিজন ইত্যাদি কারণে আমাদের কাশি হয়। ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণেও যে কাশি হতে পারে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিবেচনার বাইরে থেকে যায়। তাই যে কাশি সহজে সারছে না তা অবশ্যই ফুসফুসের ক্যান্সারের লক্ষণ কিনা বিবেচনায় নিতে হবে। এতোদিন ধরে যে কাশি ছিল তার ধরণ পরিবর্তন হল কিনা সেটা খেয়াল রাখতে। আর কাশির সাথে রক্তপাত হলে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, মাত্র একবার হলেও।
কাশি ছাড়াও ফুসফুসের ক্যান্সারের অন্যান্য লক্ষণসমূহ হচ্ছে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন বিশেষত তা স্থায়ী হওয়া, শ্বাস কষ্ট হওয়া, বুকে ব্যাথা, ক্লান্ত লাগা এবং খাবারে অরুচি ও ওজন কমে যাওয়া। শুরুর দিকে এই লক্ষণগুলো হয় খুবই মৃদু ফলে তা যথাযথ মনোযোগ পায় না।
ফুসফুসের ক্যান্সারের সাথে ধূমপানের সম্পর্ক নিবিড়। ধূমপায়ীদের ফুসফুসের ক্যান্সার বেশি হয় তা প্রমাণিত। একজন অধূমপায়ীর তুলনায় একজন ধূমপায়ীর ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা ৩০ গুণ বেশি। শুধু তাই নয়, যারা ধূমপান করেন না কিন্তু ধূমপায়ীদের আশেপাশে থাকেন তারা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। তাদেরও ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার শংকা বৃদ্ধি পায়। আবার ধূমপান না করলে ফুসফুসের ক্যান্সার হবে না এমনটাও নয়। অধূমপায়ীরাও ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন, যদিও এই হার অনেক কম, মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।
ঢাকার ভয়াবহ বায়ু দূষণের বিষয়টি আমরা গণমাধ্যমে দেখতে পাই। এই বায়ু দূষণ ফুসফুসের ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। ইট ভাটা, যানবাহন ও কল-কারখানার ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে আর নিঃশ্বাসের সাথে আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে; নির্মাণ কাজের কারণে ধূলা-বালি এবং বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ণ কণা ইত্যাদিও একইভাবে আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে।
পরিবারের সদস্যদের কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকলে এবং জিনগত ত্রুটি থাকলে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
ফুসফুসের ক্যান্সারের শুরু থেকে ক্রমশঃ অগ্রসর হওয়ার ধাপগুলিকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়। একেবারে প্রাথমিক অবস্থাকে বলা হয় স্টেজ ওয়ান, তারপর স্টেজ টু, থ্রি ও সবশেষে স্টেজ ফোর। স্টেজ ফোর পর্যায়ে রোগ শরীরের অন্যান্য এক বা একাধিক অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
স্টেজ ওয়ান ও স্টেজ টু-কে বলা হয় প্রাথমিক পর্যায় (Early Stage), এই পর্যায়ে রোগ সনাক্ত করা গেলে নিরাময় সম্ভব। স্টেজ থ্রি-র নির্দিষ্ট কিছু রোগিও নিরাময় লাভ করতে পারে। অগ্রসর স্টেজ থ্রি ও স্টেজ ফোরের রোগিদের নিরাময় সম্ভব হয় না।
ফুসফুসের ক্যান্সারের চিকিৎসার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি সার্জারি, সার্জারির মাধ্যমে ক্যান্সারে আক্রান্ত ফুসফুসের অংশ অপসারণ করা হয়। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ইত্যাদিও ফুসুফুসের ক্যান্সার চিকিৎসার বিভিন্ন পদ্ধতি। এক বা একাধিক পদ্ধতির ধাপে ধাপে প্রদান করতে হতে পারে। চিকিৎসা প্রদানের সময় রোগের স্টেজ ছাড়াও রোগির শারীরিক অবস্থা, অন্য কোন রোগ আছে কিনা এবং রোগের জিনগত প্রকৃতি ইত্যাদিও বিবেচনায় নেয়া হয়।
লেখক: বক্ষব্যাধি ও খাদ্যনালী সার্জারি বিশেষজ্ঞ এবং কনসালটেন্ট, হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতাল।
