ব্যাংক জালিয়াতিতে ধনকুবের নারীর মৃত্যুদণ্ড

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:০৯ পিএম

দেশে দেশে ব্যাংক জালিয়াতির কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু এমন কিছু জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসে যে, গোটা বিশ্বের মানুষের মাথা ঘুরে যায়, চোখ কপালে উঠে। এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যাংক জালিয়াতির কথা শিরোমামে ঘুরছে, সেটির পরিমান, এক দুই হাজার কোটি টাকা নয়, ৪৪ বিলিয়ন ডলারের, আর এমন জালিয়াতের নেতৃত্বে ছিলেন এক ধনকুবের নারী। এবার জেনে নেয়া যাক, পুরো ঘটনাটি।

এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ ভিয়েতনামের ৬৭ বছর বয়সী ধনকুবের নারী ট্রুং মাই ল্যান। তিনি একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী। তবে ধনকুবের হলেও, তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে ৪৪ বিলিয়ন ডলার ব্যাংক লুটের অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগে দোষি সাব্যস্ত হওয়ায় বৃহস্পতিবার হো চি মিন সিটির ঔপনিবেশিক যুগের আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে।

ট্রুং মাই ল্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দেশটির সবচেয়ে বড় ব্যাংক সাইগন কমার্শিয়াল ব্যাংক (এসসিবি) থেকে ১১ বছর ধরে জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তিনিসহ কয়েক ডজন আসামির বিরুদ্ধে এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। ল্যান এবং অন্য ৮৫ জন পাঁচ সপ্তাহের বিচার কাজের পরে ভিয়েতনামের ব্যবসাকেন্দ্র হো চি মিন সিটি আদালত রায় ঘোষণা করে।

সাজাপ্রাপ্তদের তালিকায় সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও পূর্ববর্তী এসসিবি নির্বাহীরা রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, জালিয়াতি এবং ব্যাংকিং আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। তবে ল্যান অভিযোগ অস্বীকার করে তার অধস্তনদের ওপর দোষ চাপিয়েছেন। তার আইনজীবীরা বলেছেন, তিনি তছরুপের সঙ্গে ছিলেন না, কারণ এসসিবিতে তার আনুষ্ঠানিক পদ নেই।

তবে আদালতের বিচারকরা তার এই যুক্তি আমলে নেননি। তারা বলেছেন, এসসিবি ব্যাংকের ৯১ দশমিক ৫ শতাংশের শেয়ারের মালিক ল্যান। সুতরাং ব্যাংকে তিনিই ছিলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। প্রকৃতপক্ষে তিনিই ব্যাংকের মালিক। তিনিই ঋণ অনুমোদনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নিয়োগেও তার হাত ছিল। ল্যানের অপরাধ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ট্রুং মাই ল্যান হো চি মিন সিটির একটি সিনো-ভিয়েতনামি পরিবার থেকে এসেছেন। আগে এ এলাকা সাইগন নামে পরিচিত ছিল। মায়ের সঙ্গে প্রসাধনীর ছোট্ট দোকান দিয়ে ট্রুং জীবন শুরু করেছিলেন। ১৯৮৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অর্থনৈতিক সংস্কারের সূচনা করার পর, জমি ও সম্পত্তি কেনা শুরু করেছিলেন, যা ডোই মোই নামে পরিচিত। ১৯৯০-এর দশকে তিনি একটি বড় হোটেল ও রেস্টুরেন্টের মালিক হন।

ট্রুং ল্যানের দখলে থাকা সব জমি ছিলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তিনি এসব জমি কব্জা করেন। অর্থনীতির বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ায় এসব সম্পত্তি ট্রুং ল্যানের দখলে চলে যায়। ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি শহরের সুপরিচিত ব্যবসায়ী ছিলেন। পরে তাঁকে তিনটি ছোট ব্যাংককে একটি বৃহত্তর সত্তায় একীভূত করার ব্যবস্থার অনুমতি দেয় সাইগন কমার্শিয়াল ব্যাংক।

ভিয়েতনামের আইনে যে কোনো ব্যাংকে ৫ শতাংশের বেশি কারও শেয়ার থাকলে তাঁকে নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু আইনজীবীরা বলছেন, শত শত শেল কোম্পানি ও তাঁর প্রক্সি হিসেবে কাজ করা ব্যক্তির মাধ্যমে ট্রুং আসলে সাইগন কমার্শিয়ালের ৯০ শতাংশেরও বেশি শেয়ারের মালিক ছিলেন। শুধু তা–ই নয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের লোকদের ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি।

এরপর নিজের নিয়ন্ত্রণ করা শেল কোম্পানির নেটওয়ার্কে শত শত ঋণ অনুমোদন করার জন্যও আদেশ দেওয়ার অভিযোগ আছে এই নারীর বিরুদ্ধে। তাঁর ঋণের পরিমাণ সব ব্যাংকের ঋণের প্রায় ৯৩ শতাংশ। আইনজীবীদের মতে, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তিন বছরের মধ্যে তিনি তাঁর গাড়িচালককে দিয়ে ব্যাংক থেকে নগদ ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তুলে তাঁর বেজমেন্টে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ল্যান বিয়ে করেছেন হংকংয়ের এক ধনী ব্যবসায়ীকে, তিনিও এখন বিচারাধীন।

ব্যক্তিগত ব্যয় পরিচালনায় উৎস হিসেবে তিনি এসসিবিকে ব্যবহার করেছেন। ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ব্যাংকিং বিধি লঙ্ঘন করে ৩৬৮টি ঋণ অনুমোদনের নির্দেশ দিয়েছেন ল্যান। এসব কারণে ব্যাংকের লোকসান দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ভিয়েতনামি দং । ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তিনি ৩০৪ ট্রিলিয়ন ভিয়েতনামি দং তছরুপ করেছেন বলে আদালতে প্রমাণ হয়েছে।

এই সময়ের মধ্যে ল্যান ব্যাংকিং বিধি লঙ্ঘন করে ঋণগুলো শ্রেণিবদ্ধ করেন। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ল্যান ৯১৬টি ঋণ অনুমোদনের নির্দেশ দেন। এই সময়ে তিনি ৩০৪ ট্রিলিয়ন ভিয়েতনামি দং তছরুপ করেছেন। এতে ব্যাংকের ক্ষতি হয়েছে ১৩০ ভিয়েতনামি দং। আইনজীবীরা এতো বড় জালিয়াতির জন্য, ল্যানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আহবান জানান। সেই আহবানে সাড়াও দিয়েছে আদালত।

ভিয়েতনামে ২০১৮ সাল থেকে বেসরকারি খাতের ব্যক্তিদের অর্থ তছরুপকে ফৌজদারি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ কারণে ল্যানের বিরুদ্ধে মামলাটি আত্মসাৎ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। ল্যান গত সপ্তাহে আদালতে বলেছেন, হতাশায় আমি আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলাম। আমি বোকা ছিলাম বলেই এই ভয়ংকর ব্যবসায়িক পরিবেশে জড়িয়ে পড়েছি। ব্যাংক খাত সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুব কম।

ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নগুয়েন ফু ট্রং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন।

আইনজীবীরা বলছেন, ঋণের ২৭ বিলিয়ন পুনরুদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা নেই। দেশটির সিক্রেটিভ কমিউনিস্ট অথোরিটি বলছে, তারা এ মামলায় ২ হাজার ৭০০ জনকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকেছে। এ মামলায় রাষ্ট্র পক্ষে ১০ জনসহ মোট ২০০ জন আইনজীবী আছেন। এ মামলার প্রমাণ মোট ১০৪টি বক্সে সংরক্ষিত আছে, যার ওজন ছয় টন। এ মামলায় ট্রুংসহ ৮৫ জনের মধ্যে ১৩ জন মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে।

ল্যানের বিরুদ্ধে রায়কে ভিয়েতনামের ইতিহাসে এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ আইনের নজির। ২০২২ সালের অক্টোবরে ল্যানের গ্রেপ্তার ছিলো ভিয়েতনামে চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মধ্যে সবচে হাই-প্রোফাইল গ্রেপ্তার। তথাকথিত ব্লেজিং ফার্নেস প্রচার ভিয়েতনামের রাজনীতির সর্বোচ্চ স্তরকে প্রভাবিত করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ভো ভ্যান থুয়ং নির্বাচনী প্রচারণায় জড়িত থাকার পর গত মার্চে পদত্যাগ করেন।

কিন্তু ল্যানের বিচারের মাত্রা গোটা দেশকে হতবাক করে দিয়েছে। ভিটিপি ভিয়েতনামের সবচেয়ে ধনী রিয়েল এস্টেট সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি ছিলো। এটির মধ্যে বিলাসবহুল আবাসিক ভবন, অফিস, হোটেল ও শপিং সেন্টার প্রকল্প ছিলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কেলেঙ্কারির মাত্রা অন্যান্য ব্যাংক বা ব্যবসা একইভাবে ভুল করেছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ভিয়েতনামের রিয়েল এস্টেট সেক্টর বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ২০২৩ সালে আনুমানিক ১,৩০০ সম্পত্তি সংস্থা বাজার থেকে সরে এসেছে। ডেভেলপাররা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য উপহার হিসেবে মূল্যছাড় এবং সোনার অফার দিচ্ছে। হো চি মিন সিটিতে দোকানঘরের ভাড়া এক তৃতীয়াংশ কমে যাওয়া সত্ত্বেও শহরের কেন্দ্রস্থলে অনেকগুলো দোকান এখনো খালি আছে।

ভিয়েতনামে দীর্ঘদিন কাজ করা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডেভিড ব্রাউন বলেছেন, আমার মনে হয়, কমিউনিস্ট শাসনামলে এ রকম বিচার কখনো হয়নি। বলা হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল নগুয়েন ফু ট্রংয়ের নেতৃত্বে ‘ব্লেজিং ফার্নেস’ এর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে এখন পর্যন্ত বিচারটি সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়ে আছে।

নগুয়েন ফু ট্রং বিশ্বাস করেন, চরম দুর্নীতির ওপর জনগণের ক্ষোভ কমিউনিস্ট পার্টির একচেটিয়া ক্ষমতার জন্য হুমকি। তিনি ২০১৬ সালে তৎকালীন ব্যবসাপন্থী প্রধানমন্ত্রীকে দলের শীর্ষ পদে ধরে রাখার জন্য কৌশল অবলম্বন করে প্রচারণা শুরু করেছিলেন। গত নভেম্বরে ভিয়েতনামের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নগুয়েন ফু ট্রং বলেন, দুর্নীতিবিরোধী লড়াই দীর্ঘমেয়াদে চলবে।

এআরএস
ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরান। শনিবার (২০ ডিসেম্বর) সকালে আগিল কেশাভারজ নামের ওই ব্যক্তির সাজা কার্যকর করা হয়...
ঝাং শেংমিনকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদে নিয়োগ দিয়েছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীতে দুর্নীতি দমনে ভূমিকা রেখে আসছেন।
দুর্নীতিবিরোধী জেন জি বিক্ষোভের পর শুক্রবার ভেঙে দেয়া পার্লামেন্ট পুনর্বহালে নেপালের প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পৌডেলের কাছে দাবি জানিয়েছে দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো।
বিশ্বজুড়ে ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ২০২৪ সালে। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট বলছে, এ মৃত্যুদণ্ডের ৯০ ভাগই হয়েছে ইরান, সৌদি আরব ও ইরাকে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ফ্যাসিলিটিস ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব মনোনীত হয়েছেন দেলোয়ার হোসেন শাহীন। 
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার বিদেশে পাচার করা অর্থ ব্যবহার করে দেশকে আবারও অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু।
জনপ্রত্যাশা পূরণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত থেকে দেশপ্রেম, সততা ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দি মোছা. রিম্পাকে (২১) গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। 
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর