বিশ্বের দুই ক্ষমতাধর নেতা ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে আলাস্কা বৈঠকের পর অনেক ধরেই নিয়েছিলেন যে, এবার হয়তো থাকবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই বৈঠকের পর ইউক্রেনের নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কিসহ ইউরোপের বড় বড় নেতাদের ওয়াশিংটনে ডেকে নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এতে করে শান্তির চুক্তির পক্ষে ধারণা আরও জোরালো হয়। ট্রাম্পও জানান, তিনি চেষ্টা করছেন পুতিন ও জেলেনস্কিকে এক টেবিলে বসাতে। কিন্তু এমন বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে ক্রেমলিন শুরু থেকে মুখে টেপ লাগিয়ে রাখে।

কিন্তু বুধবার বেইজিংয়ে চীনের সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নিতে এক হলেন বিশ্বের তিন ক্ষমতাধর নেতা- রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের শি জিনপিং এবং উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন। এই ত্রয়ী নিজেদের মধ্যে বৈঠকও করেছেন সেখানে। গোটা বিশ্ব যখন নতুন একটি সামরিক জোটের সম্ভাবনা দেখছে, ঠিক তখনই দারুণ এক খবর দিয়ে সবাইকে চমকে দিলেন রুশ নেতা পুতিন। জানালের, ইউক্রনীয় প্রতিপক্ষ জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে রাজি তিনি। তবে শর্ত হলো, ক্রেমলিনের শর্ত মেনে জেলেনস্কিকে আসতে হবে মস্কো।
ইউরোপ ও আমেরিকার একাধিক সংবাদ ও গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে বসতে প্রস্তুত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বুধবার নিজেই সে কথা জানিয়েছেন রুশ নেতা। তবে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে বসার কোনও অভিপ্রায় যে তাঁর নেই, তা-ও ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছেন পুতিন। রুশ প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, বৈঠকের জন্য মস্কোয় যেতে হবে জেলেনস্কিকে। এখনও কিয়েভ থেকে পুতিনের বক্তব্যের বিপরীতে কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি দীর্ঘদিন ধরে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের দাবি জানাচ্ছেন, যাতে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির শর্তগুলো নিয়ে সরাসরি আলোচনা করা যায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ডও দুই নেতাকে বৈঠকে বসতে আহ্বান জানিয়েছেন। চীন সফর শেষে বক্তব্য দিতে গিয়ে পুতিন বলেন, তিনি সব সময়ই জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী ছিলেন। তবে ক্রেমলিনের অবস্থান একই রকম আছে, এ ধরনের বৈঠক আগে থেকে ভালোভাবে প্রস্তুত হতে হবে এবং বাস্তব কোনো ফলাফল বয়ে আনতে হবে।

পুতিনের কথায়, জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনাকে আমি কখনোই অস্বীকার করিনি। তবে প্রশ্ন হলো, এর কোনো বাস্তব অর্থ আছে কি? সেটা দেখা যাক। ইউক্রেনে কোনো অগ্রগতি আনতে হলে কিয়েভ সরকারকে প্রথমে সামরিক আইন বাতিল করতে হবে, নির্বাচন আয়োজন করতে হবে এবং ভূখণ্ডসংক্রান্ত বিষয়ে গণভোট দিতে হবে। জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত তিনি, তবে শর্ত হলো জেলেনস্কিকে মস্কোতে যেতে হবে। তবে এমন বৈঠক আদৌ কার্যকর হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেছেন পুতিন।
প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে চলতে থাকা রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা শুরু করেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পুতিন এবং জেলেনস্কির সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক সেরেছেন তিনি। হোয়াইট হাউসে জেলেনস্কি-ট্রাম্পের বৈঠকে ইউরোপীয় নেতারাও ছিলেন। জেলেনস্কির সঙ্গী হিসাবে তাঁরা গিয়েছিলেন বৈঠকে। সেসব বৈঠকের পরে জানা যায়, শিগগিরই পুতিন এবং জেলেনস্কির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হবে। কিন্তু তা এখনও হয়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় পুতিনের এই মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

পুতিন বলেন, প্রতিটি দেশ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ করতে পারে। এটা যেমন ইউক্রেনের জন্য ঠিক, তেমন রাশিয়ার জন্যও। আমরা চাই না ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হোক। আমরা ইউক্রেনের ভূখণ্ডের দখল নিতে লড়ছি না, আমরা লড়ছি মানুষের অধিকারের জন্য। ডোনাল্ড আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক সম্ভব কিনা; আমি বলেছিলাম- এটা সম্ভব। তাকে (জেলেনস্কি) মস্কোতে আসতে দিন। আমি কখনই এমন বৈঠকের বিষয়ে কোন ধরনের অস্বীকৃতি জানায়নি।
ইউক্রেন যুদ্ধ কী শেষের পথে রয়েছে, বেইজিংয়ে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে পুতিন বলেন, সুড়ঙ্গের শেষে আলো দেখা যাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, যদি সাধারণ জ্ঞান থাকে, তবে এই সংঘাতের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বা সমাপ্তির উপায়ে সম্মত হওয়া সম্ভব। আমরা দেখছি, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের এই সমাধান খুঁজে বের করার ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আমি মনে করি, সুড়ঙ্গের শেষে আলো রয়েছে। আমরা দেখবো। অন্যথায়, আমরা আমাদের সব উদ্দেশ্য সামরিক উপায়ে সমাধান করতে বাধ্য হবো।

পুতিন বলেন, রুশ বাহিনী ইউক্রেনে ‘সব ফ্রন্টে’ অগ্রসর হচ্ছে। ইউক্রেন ‘বড় আকারের আক্রমণ’ চালাতে ‘সক্ষম নয়’ এবং বর্তমানে তারা তাদের বাহিনী পুনর্গঠন করে দুর্বলতা পূরণের চেষ্টা করছে। আমাদের এখন শিথিল হওয়া উচিত নয়। সম্ভবত তারা কিছু রিজার্ভ প্রস্তুত করছে, কিছু পদক্ষেপ বা বড় আকারের ঘটনা। কিন্তু আমাদের সামরিক বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ বলছে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর এই সক্ষমতা নেই। ইউক্রেনকে তাদের বাস্তবতা বুঝতে হবে, পশ্চিমা ভরসায় কিছু করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
এদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় ব্যর্থ হওয়ায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পুতিনের এমন মনোভাবে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা বোধ করছেন বলেও উল্লেখ করেন। তবে মস্কোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। মঙ্গলবার স্কট জেনিংসের রেডিও শোতে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আমি প্রেসিডেন্ট পুতিনের ওপর খুবই হতাশ, যদিও আমাদের মধ্যে দারুণ সম্পর্ক আছে।

তবে রাশিয়ার জন্য কী ধরনের পরিণতি অপেক্ষা করছে, তা ট্রাম্প স্পষ্ট করেননি। যদিও শান্তি চুক্তির জন্য তার দেওয়া দুই সপ্তাহের সময়সীমা এ সপ্তাহেই শেষ হতে চলেছে। তিনি শুধু বলেছেন, মানুষের জীবন বাঁচাতে আমি কিছু করব। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এমন কিছু জেনেছি যা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সবাই জানতে পারবে। যদি পুতিন ও জেলেনস্কি শান্তি আলোচনায় না বসেন, তাহলে প্রতিক্রিয়া অবশ্যই হবে।
