পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহের ওপর নতুন করে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছে দেশটির সরকার। সরকারের এই বিতর্কিত পদক্ষেপে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম সংস্থা এবং দেশীয় সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই বিধিনিষেধকে পাকিস্তানে মুক্ত গণমাধ্যমের স্থান আরও সংকুচিত করার একটি অপপ্রয়াস হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫৩তম স্থানে থাকা পাকিস্তানে গণমাধ্যমের ওপর চাপ নতুন কিছু নয়। তবে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের পাশাপাশি স্থানীয় সাংবাদিকদেরও এই নতুন নিয়মের আওতায় আনায় স্বাধীন সাংবাদিকতা এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

নতুন নির্দেশিকা ও তিন শহরের বাধ্যবাধকতা: নতুন জারিকৃত ‘ফরেন মিডিয়া ফ্যাসিলিটেশন গাইডলাইনস, ২০২৬’ অনুযায়ী পাকিস্তানভিত্তিক দেশীয় বা আন্তর্জাতিক যেকোনো সংবাদমাধ্যমের কর্মী বা ফ্রিল্যান্সারদের ইসলামাবাদ, করাচি এবং লাহোর- এই তিনটি প্রধান শহরের বাইরে যে কোনো এলাকা থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতে হলে আগে থেকে সরকারের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
পূর্বে বিদেশি সাংবাদিকদের অনুমতির প্রয়োজন হলেও পাকিস্তানি নাগরিকরা পেশাগত প্রয়োজনে পেশোয়ার বা কোয়েটার মতো সংবেদনশীল এলাকায় সহজে যাতায়াত করতে পারতেন। কিন্তু নতুন বিধিনিয়ম অনুযায়ী, তিন শহরের বাইরে অবস্থানরত বা কর্মরত সকল ফ্রিল্যান্সার ও কন্ট্রিবিউটরকেও প্রতিটি সংবাদের জন্য আলাদাভাবে অনুমতি নিতে হবে। তবে একটি অনুমতি পেতে কত দিন সময় লাগবে, তা গাইডলাইনে স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে জরুরি মুহূর্তের ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সংগ্রহ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।

আইনি ভিত্তি ও পেশাদারদের প্রতিক্রিয়া: পাকিস্তানের ডন পত্রিকার প্রবীণ সম্পাদক জাফর আব্বাস এই বিধিনিষেধকে ‘হাস্যকর ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করা এই সম্পাদক বলেন, আমি দুটি সামরিক শাসন এবং একাধিক স্বৈরাচারী সামরিক-বেসামরিক সরকারের আমলে কাজ করেছি, কিন্তু কখনও এরকম বিধিনিষেধ দেখিনি। তিন শহরের বাইরে চলাচলে অনুমতির বাধ্যবাধকতা শুধু স্বাধীন চলাচলেই বাধা দেয় না, বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকেও চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুস্তফা নওয়াজ খোকহার মন্তব্য করেছেন, এই নীতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে শ্বাসরুদ্ধ করার শামিল। যখন মানুষ স্বাধীন তথ্যের জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দিকে তাকায়, তখন এমন বিধিনিষেধ ভুয়া খবর ও অপতথ্য ছড়ানোর পথই উন্মুক্ত করবে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, এই নির্দেশিকাটির কোনো আইনি বা সংবিধিবদ্ধ ভিত্তি নেই। এটি কেবল একটি নির্বাহী আদেশ। সরকারের অভ্যন্তরীণ কার্যাবলী পরিচালনার নিয়ম দেখিয়ে সাধারণ নাগরিক বা সাংবাদিকদের ওপর আইনি বাধ্যবাধকতা চাপানো যায় না।

পাক-শাসিত কাশ্মীর ও সংবেদনশীল কভারেজ: পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপের প্রধান লক্ষ্য নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের সংবাদ প্রকাশ ঠেকানো বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে প্রতিবাদকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। বর্তমানে সেখানে স্থানীয় নির্বাচন চলছে, যা সাধারণ মানুষ বয়কট করেছে।
সম্প্রতি বিবিসিসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওই অঞ্চল থেকে প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক্সটার্নাল পাবলিসিটি উইং থেকে এক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে নির্দেশ দেয়া হয়, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে অবস্থানরত সকল সাংবাদিককে ‘অবিলম্বে ফিরে আসতে হবে’ এবং নতুন করে অনুমতিপত্রের আবেদন করতে হবে।
এমনকি আল জাজিরার এক প্রতিনিধির প্রতিবেদনকে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে পাকিস্তানে তাদের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। দুই স্থানীয় সাংবাদিকও জানিয়েছেন, কাশ্মীরের অস্থিরতা নিয়ে রিপোর্ট না করার জন্য তাদের সম্পাদকরা সতর্ক করেছেন।

সরকারের অবস্থান: অভিযোগ অস্বীকার করে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি সাংবাদিকদের চলাচলে কোনো সার্বিক নিষেধাজ্ঞা নয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে মিডিয়া যাচাই-বাছাই ও সংবাদ সংগ্রহের সুবিধার্থেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নতুন গাইডলাইনে আরও বলা হয়েছে, দেশের আদর্শ, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার পরিপন্থী কাজ করলে সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হতে পারে। সরকারের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখতে যে কোনো অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থার এই ক্ষমতা থাকা জরুরি।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের একটি দল এবং পাকিস্তান ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টের সভাপতি এই বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবিতে তথ্যমন্ত্রীর সাথে জরুরি বৈঠকের চেষ্টা করছেন।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
