পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পালাবদল ঘটেছে। দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক সময়ের বিশ্বস্ত সেনাপতি শুভেন্দু অধিকারীই এখন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন।
ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এই নেতা একটা সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তবে কয়েক বছর আগে তাঁদের মধ্যে তিক্ত সম্পর্কের জেরে দূরত্ব তৈরি হয়। শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে এক জমকালো অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী।

গত সোমবারের ভোট গণনায় দেখা গেছে, রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করেছে বিজেপি। এর মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটল এবং এই প্রথমবার হিন্দুত্ববাদী দলটি বাংলায় ক্ষমতায় এল।
গত কয়েক বছর ধরে শুভেন্দু অধিকারী নিজেকে একজন লড়াকু সংগঠক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যাঁর ক্ষমতার নাড়ি নক্ষত্র সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রয়েছে এবং বাংলার রাজনৈতিক স্রোতকে নিজের অনুকূলে আনার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি বাংলায় বিজেপির সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ, এমন এক নেতা যাঁর শক্তি দিল্লির রাজনীতির চেয়ে তৃণমূল স্তরের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ওপর বেশি নির্ভরশীল। তবে, সমালোচকদের দৃষ্টিতে তিনি রাজ্যে বর্তমান মেরুকরণের রাজনীতির এক প্রতিচ্ছবি।

দলের ব্যাপক জয়ের পর তিনি এখন বাংলার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে, শুভেন্দু অধিকারীর এই উত্থান বিজেপির হাত ধরে শুরু হয়নি।
১৯৭০ সালে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারে তাঁর জন্ম। কংগ্রেসের রাজনীতির মাধ্যমে তাঁর হাতেখড়ি হলেও পরবর্তীতে বাম-বিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী ছিলেন একজন বর্ষীয়ান সংসদ সদস্য।

উপকূলীয় বাংলায় অধিকারী পরিবার এক বিশাল রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যেখানে পরিবারের অনেক সদস্যই বিভিন্ন সময় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে নন্দীগ্রামই শুভেন্দু অধিকারীকে বড় মাপের নেতা হিসেবে পরিচিতি দেয়। ২০০৭ সালে ভূমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামে গড়ে ওঠা সহিংস আন্দোলন বাংলার রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেই আন্দোলন তৎকালীন ক্ষমতাসীন বামফ্রন্ট সরকারকে দুর্বল করে দেয় এবং ২০১১ সালে মমতার ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত করে। শুভেন্দু, যিনি সেই আন্দোলনের মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে নিজের পরিচয় সুসংহত করেন।
দীর্ঘদিন মমতার ছায়াসঙ্গী থাকার পর ২০১৬ সালে একটি স্টিং অপারেশন বা গোপন ভিডিওর মাধ্যমে বিতর্কে জড়ান তিনি। সেখানে দেখা যায়, একজন ছদ্মবেশী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বেশ কয়েকজন তৃণমূল নেতা নগদ টাকা গ্রহণ করছেন। নির্বাচনের ঠিক আগে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিওতে শুভেন্দুকেও টাকা নিতে দেখা গিয়েছিল। যদিও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং ভিডিওর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল নেতৃত্বের সাথে তাঁর সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে এবং ২০২০ সালে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক কয়েক মাস আগে তিনি নাটকীয়ভাবে বিজেপিতে যোগ দেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেন। যদিও সেবার বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি, কিন্তু মমতাকে হারানোর কৃতিত্ব শুভেন্দুকে দলের অন্দরে অনেক শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়।
পাঁচ বছর পর এবার আরও বড় এক জয় ছিনিয়ে নিলেন তিনি। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজেপি শুধু ক্ষমতাই দখল করেনি, শুভেন্দু অধিকারী মমতার দীর্ঘদিনের দুর্গ ভবানীপুরেও তাঁকে পরাজিত করেছেন। একই সাথে তিনি তাঁর নিজের কেন্দ্র নন্দীগ্রামেও জয়ী হয়েছেন। বাংলার রাজনীতিতে বিজেপির এই উত্থান এক যুগান্তকারী ঘটনা।

তবে শুভেন্দুর এই জয়যাত্রা বারবার তাঁর বিতর্কিত ও সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে। ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশন তাঁকে একটি নোটিশ পাঠিয়েছিল, যেখানে তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীকে ‘বেগম’ বলে সম্বোধন করেন এবং তাঁকে ভোট দিলে বাংলা ‘মিনি পাকিস্তান’ হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন।
গত বছর তিনি এক সভায় ঘোষণা করেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ‘মুসলিম বিধায়কদের বিধানসভা থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হবে’, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয় এবং তাঁকে বিধানসভা থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়াও, তৃণমূলের একটি চিকিৎসা শিবিরে বিতরণ করা ওষুধ নিয়ে তাঁর এক আজগুবি ও ষড়যন্ত্রমূলক মন্তব্য সমালোচনার ঝড় তোলে।
বর্তমানে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া চললেও রাজ্যে নতুন করে সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বুধবার শুভেন্দুর এক ঘনিষ্ঠ সহকারীর গুলিতে মৃত্যু হয়েছে, যা বিজেপি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছে। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছে।

রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি শুভেন্দু অধিকারীকে এখন এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মোকাবিলা করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে বৃহৎ বেসরকারি বিনিয়োগের অভাবে ধুঁকছে এবং শিক্ষিত বেকারত্ব এই রাজ্যের একটি বড় সমস্যা, যা বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের মূল ইস্যু ছিল। এছাড়াও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরিতা এবং তিক্ততার কারণে যে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা সামলানোও তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি তাঁর সমর্থকদের কাছে একজন আক্রমণাত্মক এবং লড়াকু নেতা হিসেবে সমাদৃত। কিন্তু বিরোধীদের কাছে তিনি একজন বিভাজনকারী নেতা। এখন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, একজন অগ্নিবর্ষী নেতা থেকে দক্ষ প্রশাসক হয়ে ওঠা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে রাজ্যে প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
সূত্র: বিবিসি
