নিজ জাহাজে দিয়েছিলেন আগুন, তবুও পাননি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি!

  • এক মুক্তিযোদ্ধার অজানা গল্প
আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৪:৩৯ পিএম

মুক্তিযুদ্ধের বার্তাকে বিশ্বের কাছে জানান দিতে নিজের জাহাজে নিজেই আগুন দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ জাকারিয়া। ছিলেন শিপিং ব্যবসায়ী। ৭১ সালের জুলাইয়ে মংলায় তার জাহাজ সপ্তডিঙ্গায় আগুন দেয়ার বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের বার্তা ছড়ায় বিশ্ব গণমাধ্যমে। আর জাকারিয়ার আসল যুদ্ধটা শুরু হয় ৭১ এর পর। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত জাহাজের ঋণ শোধ করতে হয় তাকে। অথচ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিটাও পাননি মোহাম্মদ জাকারিয়া। 

শাহবাজপুর জমিদার বাড়ির তৃতীয় প্রজন্মের সন্তান মোহাম্মদ জাকারিয়া। দেশভাগের সময় বাবা চলে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের পানেশ্বরে। মোহাম্মদ জাকারিয়া যখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়েন তখন তার মা মারা যান। বাবা গ্রামে থাকলেও আট ভাই বোনকে নিয়ে তিনি থাকতেন চাচা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তৎকালীন ডিআইজি আবুল হাসনাত শামসুল আলমের বাসায়।  

মোহাম্মদ জাকারিয়া (বাঁয়ে), ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও অধ্যাপক আলতাফুন্নেসা।

জুবলি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে থাকতেই বন্ধুত্ব হয় বিশিষ্ট চিকিৎসক ও মুক্তিযোদ্বা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সাথে। আমৃত্যু অটুট ছিলো সেই বন্ধুত্ব। 

মোহাম্মদ জাকারিয়া ১৯৬৮ সালে পারিবারিক সম্পদ বিক্রি করে আর ঋণ নিয়ে কেনেন দুটি তেলবাহী জাহাজ; সপ্তডিঙ্গা আর ময়ূরপঙ্খী। শুরু করেন শিপিং ব্যবসা। দেশ তখন উত্তাল। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। একই বছরের মার্চ মাসে দেখা হয় ঢাকা কলেজের ভূগোল শিক্ষক আলতাফুন্নেসার সাথে। এক দেখাতেই পছন্দ করে বিয়ের প্রস্তাব দেন জাকারিয়া। যুদ্ধ শেষে শুরু হয় তাদের পথচলা। 

মোহাম্মদ জাকারিয়ার চাচা তৎকালীন ডিআইজি আবুল হাসনাত শামসুল আলম।

এদিকে ১৯৭১ সালের ৩ জুলাই জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সেক্টর কমান্ডার এবং কে ফোর্সের অধিনায়ক খালেদ মোশাররফের দুটি অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে ঢাকায় আসেন। 

এক সাক্ষাৎকারে জাফরুল্লাহ নিজেই বলেন, আমার বন্ধু জাকারিয়া কোনো চিন্তা না করেই বললেন; মুক্তিযোদ্ধারা চাঁদপুর থেকে খুলনা যাবার পথে আমার জাহাজে আক্রমণ করতে পারবে। তেলভর্তি জাহাজ মাসব্যাপী জ্বলতে থাকলে এটি বিশ্বের সামনে মুক্তিযুদ্ধে একটি সফলতার প্রতীক হবে। 

মোহাম্মদ জাকারিয়া ও স্ত্রী অধ্যাপক আলতাফুন্নেসা।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন ও মোহাম্মদ জাকারিয়ার স্ত্রী অধ্যাপক আলতাফুন্নেছা বলেন, পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রি করে সাথে ঋণ নিয়ে স্পেশালাইজড শিপিং এন্ড ট্রেডিং কোং লিমিটেড নামে একটি কোম্পানির অধীনে জাপান থেকে দুটি নতুন জাহাজ নির্মান করে আনা হয়।

তিনি আরও বলেন, এরমধ্যে ময়ূরপঙ্খী বিমানের তেল পরিবহনের জন্য বিশেষ কাটিংয়ে নির্মাণ করা হয়। ১৬ জুলাই ১৯৬৯ থেকে বার্মা স্টার্টার চার্টার এ চলাচল করে করতে আরম্ভ করে জাহাজ দুটি। ১৯৭১ সালে মংলায় জাহাজটিতে মুক্তিযুদ্ধারা আগুন ধরিয়ে দেয়।  

জাহাজটি পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশনে ইন্স্যুরেন্স করা ছিলো। এর মূল কাগজপত্রের শর্ত অনুসারে গচ্ছিত থাকে তাদরে কাছেই। পিকিক টাকা তুলে নেয় পাকিস্তান ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে।

১৯৭১ সালে যে ঋণের পরিমাণ ছিলো ২৫ লাখ ৬৬৩৮ টাকা, পরবর্তীতে নবসৃষ্ট বাংলাদেশে শিল্প ঋণ সংস্থা থেকে ঋণগ্রহণ না করার সত্ত্বেও নতুন করে সম্পূর্ণ ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয় পরিবারটির ওপর। পিকিক টাকা তুলে একটি সংস্থার বহুগুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ঋণ পরিশোধ করতে হয়।

মোহাম্মদ জাকারিয়া (বিছানায়) ও বন্ধু ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

এটি সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র ঘটনা যেখানে দেশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করতে নিজের জাহাজ নিজেই জ্বালিয়ে দেন স্বয়ং জাহাজ মালিক। কিন্তু যুদ্ধের পর কি হলো? 

স্ত্রী আলতাফুন্নেসা বলেন, কর্নেল তাহের, আতাউল গণি ওসমানী এবং কয়েকজন মিলে পরিকল্পনা করেন যে, কি করে যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রকাশ করা হয়। তখন তাকে (মোহাম্মদ জাকারিয়া) ডেকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'তোমার কোনো আপত্তি আছে?' তখন তিনি বলেন, না, দেশের জন্য উৎসর্গ করতে আমার কোনো আপত্তি নেই। 

১৯৭২ সালে মংলা বন্দরে পানির নিচ থেকে সপ্তডিঙ্গাকে ক্রেন দিয়ে তোলা হয়।

অধ্যাপক আলতাফুন্নেসা আরও বলেন, তখন মাত্র দুই বছর হয়েছে মোহাম্মদ জাকারিয়া জাহাজ কিনেছেন। গ্রামগঞ্জের সমস্ত জায়গাজমি বিক্রি করে তিনি জাহাজ কিনেছিলেন। সেই মানুষের অন্তর এতো বড়। সেই জাহাজ কতোদিন ধরে জ্বললো, কিন্তু আমরা তা কোনোদিন জানতাম না। পরে ম্যাগাজিনে জাফরুল্লাহ ভাইয়ের লেখা থেকে বিষয়টি জানতে পারি। 

মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়ক এমজি ওসমানী তাকে সনদ দিতে চাইলেও রাজি হননি জাকারিয়া। কোনো সরকারই তার জাহাজের ক্ষতিপূরণ দিতে এগিয়ে আসেনি। বরং ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সেই জাহাজের জন্য নেওয়া ঋণ শোধ করে যেতে হয়েছে পরিবারটিকে। 

মোহাম্মদ জাকারিয়া, স্ত্রী আলফাতুন্নেসা ও দুই সন্তান।

দীর্ঘ দুই যুগ অসুস্থ থাকার পর গেলো বছর মারা যান প্রচার বিমুখ মানুষ মোহাম্মদ জাকারিয়া। কিন্তু এই না পাওয়া নিয়ে কোনো দু:খ নেই তার প্রবাসী দুই সন্তানেরও। 

অধ্যাপক আলতাফুন্নেসা বলেন, এমজি ওসমানী নিজেই সমস্ত ঘটনা জানতেন, যেহেতু উনারাই পরিকল্পনা করেছিলেন। পরে এমজি ওসমানী মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য নিজেই ডেকেছিলেন। তখন আমার স্বামী সার্টিফিকেট নিতে চাননি। তিনি বলেছিলেন, আমি আমার দেশের জন্য লড়াই করেছি। আমি আমার দেশকে ভালোবাসি। আমার মাটির জন্য আমি যুদ্ধ করেছি, অন্য কিছুর জন্য নয়। 

মোহাম্মদ জাকারিয়ার মতো এমন লাখো মানুষের বহু আত্মত্যাগেই আমাদের স্বাধীনতা। যদিও মৃত্যুর পরও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো স্বীকৃতি মেলেনি মোহাম্মদ জাকারিয়ার। আজও সেই আফসোস বয়ে বেড়ান তার স্ত্রী আলতাফুন্নেসা।

 

আরবিএস
সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর ভার্সিটি ঘাট থেকে যতো দূর চোখ যায়, কেবলই উত্তাল যমুনা। নৌকায় প্রায় ঘণ্টাখানেকের নদীপথ পাড়ি দিয়ে, তারপর দু-চাকার বাহনে চরের ধূ ধূ ধূলিপথ। চরের শান্ত নিভৃত এক গ্রামে গড়ে উঠেছে...
ভারতের নয়াদিল্লির মালভিয়া নগর এলাকার একটি হোটেলে লাগা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর...
পরিবেশ রক্ষা, কৃষিজমি সংরক্ষণ এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে সরকার গত কয়েক বছরে জোরালো অভিযান চালিয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার...
ফ্যাসিস্ট সরকারের আমল দেশ, গণতন্ত্র ও সন্তানদের ভবিষ্যতের যে ক্ষতি করেছে তা ভুলে না যাওয়ার আহবান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে তিনি ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে তৈরি হওয়া...
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রায় ১৫ বছর আগে সংঘটিত এক কিশোরী সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা করেছে আদালত। রায়ে তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং আরও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পাবনায় এক আওয়ামী লীগ নেতাকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার (১৮ জুলাই) বিকেলে জেলার আতাইকুলা থানাধীন ভুলবাড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর উত্তরপাড়ার একটি বাগান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
১৯৭০ বিশ্বকাপে জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার গার্ড মুলারের পর প্রথম পুরুষ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে দুই অঙ্কের গোলের অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করলেন কিলিয়ান এমবাপে। কিন্তু এমন কীর্তির রাতেও মাঠ ছাড়তে...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর