বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আমলে সেনা ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের বিনা বিচারে হত্যা ও গুমের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
রোববার (২ অক্টোবর) প্রেসক্লাবে এক মানববন্ধনে সংসদ ভবন এলাকা থেকে জিয়ার কবর সরিয়ে নেয়া এবং সেই সময়ে নিহতদের শহীদের মর্যাদা দেয়াসহ পাঁচ দফা দাবিও জানিয়েছেন তারা।
১৯৭৭ সালে ২ অক্টোবর ঢাকা বিমানবন্দরে জাপানি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায় জিম্মি সংকটের সময় বিমান বাহিনীতে অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়।
সেটি দমনে বিমান বাহিনীর তিন হাজার সদস্যকে কারাদণ্ড, চাকুরিচ্যুত এবং সেনা ও বিমান বাহিনীর সহস্রাধিক সদস্যকে সামরিক আদালতের সংক্ষিপ্ত বিচারে ফাঁসি দেয়া হয়।
তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের নির্দেশে বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার করা হয়েছিলো। প্রায় ১৩০০ জনের বেশি সদস্যকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
সেই বিচারে ঘটনায় কাদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, তাদের অপরাধ কি, কোথায় তাদের দাফন হয়েছে- এসব তথ্য কোথাও নেই; এমন কি তাদের স্বজনদেরও জানানো হয়নি।
প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন থেকে সেই ঘটনার জন্য তখনকার জান্তা জিয়ার মরণোত্তর বিচার ও সংসদ এলাকা থেকে তার কবর সরিয়ে নেয়ার দাবি জানান নিহতদের স্বজনরা।
সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউর রহমান কর্তৃক ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর সেনা ও বিমানবাহিনীর কারাদণ্ডপ্রাপ্ত, চাকরিচ্যুত এবং ফাঁসি দেওয়া পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
তারা বলেন, জিয়া কবর ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সংসদ এলাকা থেকে অপসারণ না করলে তারাই বিজয়ের মাসের শুরু থেকে কবর অপসারণের প্রাথমিক কাজ শুরু করবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ফাঁসি হওয়া বিমানবাহিনীর সার্জেন্ট আবুল বাশার খানের মেয়ে বিলকিস বেগম। এ সময় সংগঠনটি পাঁচ দফা দাবি পেশ করা হয়।
দাবিগুলো হলো- ফাঁসি হওয়া সদস্যদের কোথায় সমাহিত করা হয়েছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই স্থান চিহ্নিত করে দিতে হবে।
অন্যায়ভাবে ফাঁসি হওয়া সদস্যদের নামের তালিকা প্রকাশ করা এবং শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
নিহত সদস্যদের নিজ নিজ পদে সর্বোচ্চ র্যাংকে পদোন্নতি দেখিয়ে বর্তমান স্কেলে বেতন-ভাতা, পেনশনসহ পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসন ও সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচার করতে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে।
জিয়াউর রহমানের কবর জাতীয় সংসদ এলাকা থেকে অপসারণ করতে হবে। অন্যথায়, আগামী ১ ডিসেম্বর মায়ের কান্না সংগঠনের সদস্যরা কবর অপসারণের প্রাথমিক কাজ শুরু করবে।
মায়ের কান্না সংগঠনের আহবায়ক কামরুজ্জামান মিয়া লেলিন বলেন, একটি চিঠি দিয়ে আমার মাকে জানানো হয়েছিল আপনার স্বামীকে মারা হয়েছে। শুধু চিঠি পেয়েছি কিন্তু লাশ পাইনি।
তিনি আরো বলেন, রাতের আঁধারে আজিমপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়। কিন্তু আজও আমরা আমাদের বাবাদের বিচার ও লাশ শনাক্ত করতে পারিনি। আমরা এর বিচার দাবি করছি।
কর্পোরাল মোবারক আলীর সন্তান মমতাজ বেগম বলেন, আমার ছয় মাস বয়সের সময় আমার বাবাকে হত্যা করে জিয়াউর রহমান। আমাদের পিতার মরদেহ কোথায় আমরা তা জানি না।
তিনি বলেন, কোন অপরাধে তাদের ফাঁসি দিলো খুনি জিয়া সেটাও জানি না। রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে আমি আমার পিতার দাফনের স্থান কোথায় সেটা জানতে চাই?
লিখিত বক্তব্য বিলকিস বেগম বলেন, ১৯৭৭ এর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে জাপান রেড আর্মির সদস্যরা জাপান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ছিনতাই করে।
সেই বিমানটি জোরপূর্বক ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করায়। বিমান ছিনতাই এবং যাত্রী জিম্মির ঘটনায় ঢাকা সেনানিবাস এবং বিমানবন্দর এলাকায় ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
১৯৭৭ সালের ১ অক্টোবর বিমান ছিনতাই ঘটনার অবসান ঘটে। কিন্তু সুযোগ বুঝে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিমান বাহিনীর সৈনিক ব্যারাকে বিদ্রোহের সূত্রপাত করান।
কারণ তিনি বিমান বাহিনীকে সেনাবাহিনীর মধ্যে আত্মীকরণ করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্তের সাথে একমত ছিলেন না বিমান বাহিনীর তৎকালীন সদস্যরা।
জাপানি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার সুযোগে জিয়া কিছু সৈনিককে লেলিয়ে দিয়ে বিমান বাহিনীর ১১ জন অফিসারকে গুলি করে হত্যা করায়।
এই ঘটনাকে পুঁজি করে বিদ্রোহ দমনের নামে নির্বিচারে বিমান বাহিনীর বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের গ্রেফতার করে গুম করতে শুরু করে।

তিনি আরো বলেন, ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর তথাকথিত বিদ্রোহ দমনের নামে মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের আগে ফাঁসি কার্যকর করে পরে কোর্ট মার্শাল করে বিচার করা হয়েছে।
ফাঁসি কার্যকর শুরু হয় ১৯৭৭ সালের ৯ অক্টোবর। অথচ বিদ্রোহ দমনের বিচার কাজের আইন পাস হয় ১৪ অক্টোবর।
জিয়া ঘোষিত মার্শাল ল’ ট্রাইবুনালগুলোতে বিচার প্রহসনের সময় একজন সৈনিকেরা জীবন মরণের সিদ্ধান্ত নিতে গড়ে ১ মিনিটের চেয়েও কম সময় দেয় ট্রাইব্যুনাল প্রধানেরা।
পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকর হওয়া ১২১ জনের তালিকা পাওয়া গেছে। কুমিল্লা কারাগারে ৭২ জনের নামের তালিকা পাওয়া গেছে।
বগুড়া কারাগারে ১৬ জন, রংপুরে ৭ জনের নামের তালিকা পাওয়া গেছে। কিন্তু বিমান বাহিনী সদর দপ্তরের হিসেবে ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর পরবর্তী সময়ে ৫৬১ জন সৈনিক নিখোঁজ হয়েছেন। যাদের কখনই আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঠিক একই সময়ে বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে ২২ বেঙ্গল বিদ্রোহ করলে খুনি জিয়া পুরো ইউনিটের সদস্যদের গুম করে দেয়। যাদের সংখ্যা দুই শতাধিক।
আরও পড়ুন: ভোটকে সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক হামলায় আশঙ্কায় কাদের
সেনাবাহিনীর গুম হওয়া সদস্যদের বেশিরভাগ বীর মুক্তিযোদ্ধা। যাদের ফাঁসিতে নয় ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যু নিশ্চিত করেছিলো খুনি জিয়া।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সংগঠন ‘মায়ের কান্না’র পক্ষ থেকে সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি পেশ করা হয়।
একাত্তর/আরএ
